চার মাস আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় নিহত ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি-এর জানাজা ও দাফনকে কেন্দ্র করে নজিরবিহীন রাষ্ট্রীয় আয়োজন শুরু করেছে ইরান। দেশটির দাবি, ইরান ও ইরাকের পাঁচটি শহরজুড়ে ছয় দিনব্যাপী কর্মসূচিতে ১ কোটি ৫০ লাখ থেকে ২ কোটি মানুষের অংশগ্রহণ হতে পারে, যা আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ রাষ্ট্রীয় জানাজায় পরিণত হতে পারে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা, এএফপি ও সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই শোকানুষ্ঠানকে শুধু ধর্মীয় আয়োজন নয়, বরং ইরানি রাষ্ট্রের ঐক্য, স্থিতিশীলতা ও রাজনৈতিক শক্তির প্রতীক হিসেবে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরতে চায় তেহরান।
শেষ শ্রদ্ধা থেকে দাফন—ছয় দিনের কর্মসূচি
শনিবার রাজধানী তেহরান-এর গ্র্যান্ড মোসাল্লা প্রার্থনা কমপ্লেক্সে জনসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য খামেনির মরদেহ রাখা হবে। লাখো মানুষ সেখানে শেষ শ্রদ্ধা জানাবেন।
সোমবার তেহরানের প্রধান সড়কগুলোতে বিশাল শোকযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর মঙ্গলবার মরদেহ নেওয়া হবে কোম-এ। বুধবার কর্মসূচি সীমান্ত পেরিয়ে ইরাকের নাজাফ ও কারবালা-য় পৌঁছাবে। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার খামেনির জন্মস্থান মাশহাদ-এর ইমাম রেজার মাজার-এ তাকে দাফন করা হবে।
কফিনের সামনে মানুষের ঢল
শুক্রবার থেকেই তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা মসজিদে খামেনির কফিনের সামনে ভিড় করতে শুরু করেন হাজারো শোকাহত মানুষ। মাশহাদের ইমাম রেজার মাজার থেকে আনা একটি লাল পতাকা কফিনের ওপর স্থাপন করা হয়েছে, যা শিয়া ঐতিহ্যে শহীদত্ব ও প্রতিশোধের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।

এদিকে আহমাদ ওয়াহিদি যুদ্ধ শুরুর পর প্রথমবারের মতো জনসমক্ষে এসে খামেনির প্রতি শ্রদ্ধা জানান। দীর্ঘদিন আড়ালে থাকার পর বৃহস্পতিবার রাতে তার এই উপস্থিতিকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছে এএফপি।
রাজনৈতিক বার্তাও দিচ্ছে তেহরান
বিশ্লেষকদের মতে, এই জানাজা কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; বরং ইরানের রাজনৈতিক অবস্থান ও রাষ্ট্রীয় শক্তিরও প্রতীক।
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, এই শোকযাত্রা বিশ্বকে দেখাবে যে ইরান কোনো চাপ বা নিপীড়নের সামনে মাথা নত করে না এবং তাদের নেতার রক্তের বিচার ভুলে যাবে না।
সিএনএনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, দীর্ঘ অর্থনৈতিক সংকট ও যুদ্ধের মধ্যেও এত বড় আয়োজনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মহলে একটি স্পষ্ট বার্তা দিতে চাইছে তেহরান—ইসলামি প্রজাতন্ত্র এখনো অটুট রয়েছে এবং খামেনিকে প্রতিরোধ ও দৃঢ়তার প্রতীকে প্রতিষ্ঠা করা হবে।
সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ও বিশাল প্রস্তুতি
সম্ভাব্য বিপুল জনসমাগম সামাল দিতে দেশজুড়ে নেওয়া হয়েছে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
সরকার জানিয়েছে, তেহরানে মোতায়েন করা হয়েছে—
- ২ হাজার ৫০০টি অ্যাম্বুলেন্স
- ২১টি হেলিকপ্টার
- ১০০টি ড্রোন
- হাজারো উদ্ধারকর্মী
এ ছাড়া প্রস্তুত রাখা হয়েছে ২০ হাজার শ্রেণিকক্ষ, কয়েক ডজন হাসপাতাল এবং প্রায় পাঁচ লাখ লিটার স্যালাইন।
রাজধানীর বিমানবন্দর সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হবে। ব্যক্তিগত যান চলাচলেও কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। পাশাপাশি ৭০০টির বেশি পার্কিং এলাকা খালি রাখা হয়েছে।
শোকাহত মানুষের খাবারের জন্য ৫ কোটি রুটি তৈরির পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এ কাজে মোবাইল বেকারিও মোতায়েন করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ
ইরানের দাবি, ৩০টির বেশি দেশের সরকারি প্রতিনিধি এবং ৯০টি দেশের ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব এই আয়োজনে অংশ নেবেন।
পাকিস্তান, রাশিয়া ও চীন-এর প্রতিনিধিদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে। যদিও পশ্চিমা কোনো রাষ্ট্রকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি, তবুও আটজন রাষ্ট্রপ্রধান ও ১২ জন পার্লামেন্ট স্পিকার অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার কথা জানিয়েছে ইরান।
এ আয়োজন কভার করবেন প্রায় ১৪ হাজার সাংবাদিক, যার মধ্যে ৯০০ জন বিদেশি।
স্থগিত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা
মার্কিন গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, দোহা-য় কাতার ও পাকিস্তান-এর মধ্যস্থতায় চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইরান পরোক্ষ আলোচনা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, যাতে সংশ্লিষ্ট কূটনীতিক ও আলোচকরা শোকানুষ্ঠানে অংশ নিতে পারেন।
মোজতবা খামেনিকে ঘিরে জল্পনা
জানাজাকে ঘিরে সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছেন খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনি।
ফেব্রুয়ারির একই হামলায় তার মা ও স্ত্রী নিহত হন এবং তিনি নিজেও আহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর থেকে তিনি আর জনসমক্ষে আসেননি; কেবল লিখিত বার্তার মাধ্যমে সমর্থকদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, জানাজায় তার উপস্থিতি নতুন নেতৃত্বের বৈধতা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আর অনুপস্থিতি তার শারীরিক অবস্থা ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিতে পারে।
ভিন্ন মতও রয়েছে
তবে সব ইরানিই এই রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠান নিয়ে সমানভাবে উচ্ছ্বসিত নন।
সিএনএনকে তেহরানের এক বাসিন্দা জানিয়েছেন, বিশাল জনসমাগমের কারণে টানা দুই দিন তিনি জ্বালানি সংগ্রহ করতে পারেননি। আবার অনেকেই ছুটির সুযোগে রাজধানী ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন।
সব মিলিয়ে, ইরানি কর্তৃপক্ষের লক্ষ্য একটাই—আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শেষযাত্রাকে আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম রাষ্ট্রীয় জানাজায় পরিণত করা এবং বিশ্বমঞ্চে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ঐক্য, স্থিতিশীলতা ও রাজনৈতিক শক্তির বার্তা পৌঁছে দেওয়া।
আরু/


