দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে টানা ভারী বৃষ্টি ও বন্যার কারণে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। অনেক এলাকায় রাস্তা-ঘাট, বসতবাড়ি ও কবরস্থান পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় মৃত ব্যক্তিদের দাফন নিয়ে দেখা দিয়েছে জটিলতা। এমন পরিস্থিতিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নানা প্রশ্ন ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে পড়ছে—বন্যার সময় মৃত ব্যক্তিকে কীভাবে দাফন করা হবে, ইসলাম এ বিষয়ে কী নির্দেশনা দিয়েছে?
ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী, কোনো মুসলমান মৃত্যুবরণ করলে তাকে যথাসম্ভব দ্রুত গোসল, কাফন, জানাজার নামাজ এবং দাফনের ব্যবস্থা করা সুন্নত। তবে ইসলাম একই সঙ্গে মানুষের সক্ষমতা ও বাস্তব পরিস্থিতিকেও গুরুত্ব দিয়েছে। তাই যুদ্ধ, বন্যা, ভূমিকম্প বা অন্য কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে স্বাভাবিকভাবে দাফন করা সম্ভব না হলে শরিয়ত বিকল্প ব্যবস্থার অনুমতি দেয়।
ধর্মীয় বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি কোনো এলাকার কবরস্থান সম্পূর্ণ পানির নিচে তলিয়ে যায় অথবা সেখানে দাফন করলে মরদেহের সম্মানহানি বা ক্ষতির আশঙ্কা থাকে, তাহলে মৃত ব্যক্তিকে নিরাপদ অন্য কোনো স্থানে নিয়ে গিয়ে দাফন করাই শরিয়তসম্মত। প্রয়োজনে পাশের গ্রাম, ইউনিয়ন বা অন্য এলাকার কবরস্থানেও দাফন করা বৈধ। ইসলামে নির্দিষ্ট কোনো কবরস্থানে দাফন করাকেই বাধ্যতামূলক করা হয়নি; বরং মৃত ব্যক্তির মর্যাদা রক্ষা করাই সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ।
আলেমরা আরও বলেন, দুর্যোগের কারণে পরিবহন ব্যবস্থা ভেঙে পড়লে বা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে মৃতদেহ নিরাপদ স্থানে পৌঁছাতে কিছুটা সময় লাগতে পারে। এ ধরনের অনিবার্য বিলম্বের কারণে শরিয়তের দৃষ্টিতে কোনো গুনাহ নেই। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পরও অযথা দাফনে বিলম্ব করা ইসলামের শিক্ষা নয়।
অনেক সময় দেখা যায়, বন্যার পানির কারণে মরদেহ নৌকা, ট্রলার বা ভেলায় করে অন্যত্র নিয়ে যেতে হয়। ইসলামি বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি সম্পূর্ণ বৈধ, যদি উদ্দেশ্য হয় মরদেহকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে গিয়ে যথাযথভাবে দাফন করা। কারণ ইসলাম মৃত ব্যক্তির সম্মান, পরিচ্ছন্নতা ও মর্যাদাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়।
তারা আরও বলেন, ইসলাম কখনোই মৃতদেহকে অবহেলা করা, পানিতে ফেলে রাখা বা মর্যাদাহানিকর কোনো আচরণের অনুমতি দেয় না। বরং যে পরিস্থিতিই হোক না কেন, সামর্থ্য অনুযায়ী সর্বোত্তম উপায়ে দাফনের ব্যবস্থা করাই মুসলমানদের দায়িত্ব।
ইসলামের অন্যতম মূলনীতি হলো—’আল্লাহ কোনো ব্যক্তিকে তার সাধ্যের বাইরে দায়িত্ব দেন না।’ তাই দুর্যোগকালীন পরিস্থিতিতে মানুষের সামর্থ্য, নিরাপত্তা ও বাস্তবতাকে বিবেচনায় রেখেই শরিয়তের বিধান প্রয়োগ করা হয়। এ কারণেই ইসলামকে সহজ, ভারসাম্যপূর্ণ ও মানবিক ধর্ম হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
ধর্মীয় বিশেষজ্ঞরা সবাইকে গুজব বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত বিভ্রান্তিকর তথ্যের পরিবর্তে কুরআন-সুন্নাহ এবং নির্ভরযোগ্য আলেমদের ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করার আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের মতে, দুর্যোগের সময় ধৈর্য, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং ইসলামের নির্দেশনা অনুসরণ করলেই মৃত ব্যক্তির যথাযথ মর্যাদা রক্ষা করা সম্ভব।
বন্যার মতো দুর্যোগে পরিস্থিতি যতই কঠিন হোক না কেন, ইসলামের মূল শিক্ষা হলো—মৃত ব্যক্তির সম্মান অক্ষুণ্ন রেখে যত দ্রুত সম্ভব শরিয়তসম্মতভাবে দাফন সম্পন্ন করা। বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ইসলাম যে সহজ ও মানবিক দিকনির্দেশনা দিয়েছে, তা দুর্যোগকালীন সময়ে মুসলিম সমাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পথনির্দেশনা হিসেবে বিবেচিত হয়।
ইতি/


