ভেনেজুয়েলায় ভয়াবহ ভূমিকম্পে ধসে পড়া একটি ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে ১৮ দিন আটকে থাকার পর ১৮ দিনের নবজাতক সন্তানকে বুকে আগলে অলৌকিকভাবে জীবিত উদ্ধার হয়েছেন এক মা। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সেই রুদ্ধশ্বাস অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন তিনি।
উদ্ধার হওয়া ওই নারীর নাম দায়ানা পাতিনো। তিনি জানান, ধ্বংসস্তূপের অন্ধকারে তার ১৮ দিনের ছেলে হুয়ান ডেভিডই তাকে বেঁচে থাকার শক্তি জুগিয়েছে। শিশুটি শ্বাস নিচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত হতে তিনি বারবার তার ছোট্ট নাকে হাত দিয়ে দেখতেন।
দায়ানার ভাষায়, “যতক্ষণ ও বেঁচে ছিল, আমিও বেঁচে থাকার লড়াই চালিয়ে গেছি।”
গত বুধবার আঘাত হানা জোড়া ভূমিকম্পে ভেনেজুয়েলায় ব্যাপক প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞ ঘটে। দেশটির অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট এটিকে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সরকারি হিসাবে অন্তত দেড় হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং এখনও হাজার হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকলেও জীবিত কাউকে পাওয়ার সম্ভাবনা ক্রমেই কমে আসছে।
দায়ানা জানান, উত্তর উপকূলীয় লা গুয়াইরায় নিজেদের আটতলা অ্যাপার্টমেন্টের রান্নাঘরে কাজ করার সময় ভূমিকম্প শুরু হয়। প্রথমে এটিকে হালকা কম্পন মনে হলেও মুহূর্তের মধ্যে পুরো ভবন ধসে পড়ে। তিনি ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরেছিলেন এবং এরপর নিজেকে কাদামাটি ও ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা অবস্থায় দেখতে পান।
ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়ার পর তিনি প্রথমে সাহায্যের জন্য চিৎকার করলেও পরে বুঝতে পারেন এতে শুধু শক্তি নষ্ট হবে। তাই তিনি সিদ্ধান্ত নেন, উদ্ধারকারীদের শব্দ শুনলেই কেবল চিৎকার করবেন।
তিনি আরও বলেন, তার বাম পা কংক্রিটের নিচে চাপা পড়ে ছিল এবং কপাল একটি শক্ত পাথরের সঙ্গে আটকে ছিল। নড়াচড়ারও কোনো সুযোগ ছিল না। একসময় পিঠের নিচে একটি বাইবেল অনুভব করে তিনি নতুন করে মানসিক শক্তি পান এবং প্রার্থনা করতে থাকেন।
ধ্বংসস্তূপের অন্ধকারের মধ্যেও ওপরের দিকে ক্ষীণ একটি আলোর বিন্দু দেখতে পেতেন দায়ানা। দীর্ঘ সময় পর ভাইয়ের কণ্ঠে নিজের নাম শুনে তিনি বুঝতে পারেন, উদ্ধারকারীরা কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন। তখন তিনি সর্বশক্তি দিয়ে চিৎকার করে জানান, তিনি জীবিত আছেন।

পরে অত্যন্ত সতর্ক ও জটিল উদ্ধার অভিযানের মাধ্যমে গত বৃহস্পতিবার রাতে মা ও শিশুকে জীবিত বের করে আনা হয়।
ভূমিকম্পে দায়ানার দুই পায়ে আঘাত লাগলেও নবজাতক হুয়ান ডেভিড প্রায় অক্ষত ছিল। অন্যদিকে, ভূমিকম্পের সময় বাইরে থাকা তার স্বামী গারসন কোনোমতে প্রাণে বাঁচলেও ধসে পড়া ভবন দেখে স্ত্রী ও সন্তানকে আর জীবিত পাবেন না বলেই ধরে নিয়েছিলেন।
উদ্ধারের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, গারসন আবেগাপ্লুত হয়ে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছেন।
তিনি বলেন, “আমি ভেবেছিলাম ওরা আর বেঁচে নেই। কিন্তু যখন আমার ছেলেকে অক্ষত অবস্থায় দেখলাম, মনে হলো আমিও যেন নতুন জীবন ফিরে পেয়েছি।”
এই ভূমিকম্পে তাদের বাড়িঘর ও সব সম্পদ ধ্বংস হয়ে গেছে। পরিবারের প্রিয় পোষা কুকুরটিও এখনও নিখোঁজ। তবু হতাশ নন এই দম্পতি।
গারসন বলেন, “আমরা সবকিছু হারিয়েছি, কিন্তু আমরা বেঁচে আছি—এটাই সবচেয়ে বড় পাওয়া। আমরা আবার নতুন করে সব গড়ে তুলব।”
আরু/


