২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে নরওয়ের কাছে ২-১ ব্যবধানে হেরে ব্রাজিলের বিদায়ের পরপরই আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে নিজের অবসরের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছেন আধুনিক ফুটবলের অন্যতম সেরা তারকা নেইমার জুনিয়র। মেটলাইফ স্টেডিয়ামে বিদায়লগ্নে আবেগঘন কণ্ঠে ৩৪ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড বলেন, “আমি চেষ্টা করেছি, অনেক চেষ্টা করেছি। কিন্তু এবার সত্যিই সব শেষ। যেখানে শুরু করেছিলাম, সেখানেই শেষ করলাম।”
কাকতালীয়ভাবে, ২০১০ সালে ১০ আগস্ট মাত্র ১৮ বছর বয়সে এই মেটলাইফ স্টেডিয়ামেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে ব্রাজিলের জার্সিতে অভিষেক হয়েছিল নেইমারের। এরপর দ্রুতই তিনি হয়ে ওঠেন দলের প্রাণভ্রমরা। অভিষেক ম্যাচেই হেডে গোল করে নিজের আগমনী বার্তা দেন। এরপর টানা ১৬ বছর ব্রাজিলের আক্রমণভাগের সবচেয়ে বড় ভরসা ছিলেন তিনি।
জাতীয় দলের হয়ে নেইমার তাঁর প্রথম ফিফা বিশ্বকাপ খেলেন ২০১৪ সালে ঘরের মাঠে। এরপর তিনি যথাক্রমে ২০১৮, ২০২২ এবং সবশেষ ২০২৬ সালের বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছেন। দেশের হয়ে মোট ৪টি বিশ্বকাপে মাঠে নামার গৌরব অর্জন করেছেন তিনি। বিশ্বকাপে তার মোট গোল ৯টি (২০২৬ পর্যন্ত)।
ব্রাজিলের জার্সিতে নেইমারের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার ছিল সাফল্য ও রেকর্ডে ভরপুর। ২০১৩ সালে তিনি ব্রাজিলকে ফিফা কনফেডারেশনস কাপ জেতাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এবং টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের (গোল্ডেন বল) পুরস্কার লাভ করেন। ২০১৬ সালের রিও অলিম্পিকে অধিনায়ক হিসেবে নেতৃত্ব দিয়ে ব্রাজিলকে প্রথমবারের মতো অলিম্পিক ফুটবলে স্বর্ণপদক এনে দেন। এর আগে ২০১১ সালে দক্ষিণ আমেরিকান অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপ জয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার পাশাপাশি টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতাও হন। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শেষ করেন ১৩০ ম্যাচে ৮০ গোল করে,যা ব্রাজিল পুরুষ দলের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এছাড়া জাতীয় দলের হয়ে করেছেন ৫৯টি অ্যাসিস্ট। চারটি ভিন্ন ফিফা বিশ্বকাপে গোল করার কীর্তি গড়ে তিনি পেলের পর দ্বিতীয় ব্রাজিলিয়ান ফুটবলার হিসেবে ইতিহাসে নাম লেখান। গোলের পাশাপাশি অ্যাসিস্টেও তিনি ছিলেন জাতীয় দলের অন্যতম সেরা পারফরমার।
ক্লাব ক্যারিয়ারের সাফল্য
ক্লাব ফুটবলেও নেইমারের অর্জনের ঝুলি সমানভাবে সমৃদ্ধ। ব্রাজিলের সান্তোসের হয়ে ২০১১ সালে কোপা লিবার্তাদোরেস ও রেকোপা সুদামেরিকানা জয়ের পাশাপাশি তিনবার ক্যাম্পিওনাতো পাওলিস্তা শিরোপা জেতেন। এরপর বার্সেলোনায় যোগ দিয়ে ২০১৪-১৫ মৌসুমে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, দুটি লা লিগা, তিনটি কোপা দেল রে, একটি ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপ এবং একটি উয়েফা সুপার কাপ জয়ের স্বাদ পান। পরে প্যারিস সেইন্ট-জার্মেইনের (পিএসজি) হয়ে পাঁচটি লিগ ওয়ান, তিনটি কুপ দ্য ফ্রান্স, দুটি কুপ দ্য লিগ এবং চারটি ট্রফে দে শ্যাম্পিয়ন জেতেন। সৌদি আরবের আল-হিলালের হয়ে সৌদি সুপার কাপও নিজের অর্জনের তালিকায় যোগ করেন। এরপর তিনি শৈশবের ক্লাব সান্তোসে ফিরে ক্যারিয়ারের নতুন অধ্যায় শুরু করেন।
ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের স্বীকৃতিস্বরূপ নেইমার বহু মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার অর্জন করেছেন। তিনি দক্ষিণ আমেরিকার বর্ষসেরা ফুটবলারের স্বীকৃতি পেয়েছেন, একাধিকবার ব্রাজিলিয়ান বর্ষসেরা ফুটবলার নির্বাচিত হয়েছেন এবং ২০১৪-১৫ মৌসুমে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের যৌথ সর্বোচ্চ গোলদাতার সম্মান অর্জন করেন। এছাড়া একাধিকবার ফিফা ফিফপ্রো ওয়ার্ল্ড একাদশ ও উয়েফা টিম অব দ্য ইয়ারে জায়গা পেয়েছেন। বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিগত পুরস্কার ব্যালন ডি’অরের শীর্ষ তিনেও একাধিকবার স্থান করে নিয়েছেন তিনি।
যে আক্ষেপ থেকে গেল
ক্যারিয়ারে অসংখ্য শিরোপা, রেকর্ড ও ব্যক্তিগত সাফল্য অর্জন করলেও নেইমারের সবচেয়ে বড় অপূর্ণতা হয়ে থাকল ফিফা বিশ্বকাপ। ২০১৪ সালে ইনজুরির কারণে সেমিফাইনাল খেলতে না পারা, ২০১৮ সালে কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায়, ২০২২ সালে ক্রোয়েশিয়ার কাছে টাইব্রেকারে হার এবং ২০২৬ সালে শেষ ষোলো থেকেই বিদায়—প্রতিবারই বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন ভেঙে যায়।
বিশ্বকাপ ট্রফি অধরা থাকলেও ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসে নেইমারের নাম স্বর্ণাক্ষরেই লেখা থাকবে। গোল, রেকর্ড, শৈল্পিক ফুটবল আর অসংখ্য স্মরণীয় মুহূর্ত উপহার দিয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানালেন ‘সেলেসাও’-এর সর্বকালের অন্যতম সেরা তারকা।
আরু/


