ওসমাজে ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, পারিবারিক বিরোধ, দাম্পত্য কলহ কিংবা ব্যক্তিগত শত্রুতার জেরে প্রতিপক্ষকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে কালো জাদুর আশ্রয় নেওয়ার অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়। অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে—কালো জাদু কি সত্যিই আছে? এ বিষয়ে ইসলামের অবস্থান কী এবং এর থেকে বাঁচার উপায় কী?
জাদু সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি
আরবি ভাষায় জাদুকে বলা হয় ‘সিহর’। ইসলামী পরিভাষায় সিহর বলতে শয়তান ও জিনের সহযোগিতা, কুফরি বাক্য বা বিশেষ অপকর্মের মাধ্যমে মানুষের ক্ষতি করার প্রচেষ্টাকে বোঝানো হয়।
পবিত্র কোরআনে জাদুর অস্তিত্বের কথা উল্লেখ রয়েছে। সূরা আল-বাকারার ১০২ নম্বর আয়াতে হারুত ও মারুতের ঘটনা বর্ণনা করে আল্লাহ তাআলা জানান, মানুষ জাদু শিখে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটানোর মতো কাজ করত। তবে একই আয়াতে স্পষ্ট বলা হয়েছে, আল্লাহর অনুমতি ছাড়া জাদু কারও কোনো ক্ষতি করতে পারে না।
অর্থাৎ ইসলাম জাদুর অস্তিত্ব স্বীকার করলেও এটাও শিক্ষা দেয় যে, একজন মুমিনের ভয় বা ভরসা কেবল আল্লাহর ওপরই হওয়া উচিত।
কোরআনে হজরত মুসা (আ.)-এর যুগের জাদুকরদের কথাও এসেছে। তারা মানুষের চোখে বিভ্রম সৃষ্টি করলেও আল্লাহর দেওয়া মুজিজার সামনে তাদের সব জাদু ব্যর্থ হয়ে যায়।
এ ছাড়া সহিহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপরও একবার জাদু করা হয়েছিল। তবে তা তাঁর নবুওয়ত বা ওহির ওপর কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি; সাময়িক শারীরিক অস্বস্তি সৃষ্টি হয়েছিল। পরে আল্লাহ তাআলা তাঁকে বিষয়টি জানিয়ে দেন এবং সুরা আল-ফালাক ও সুরা আন-নাসের মাধ্যমে এর প্রতিকার শিক্ষা দেন।
জাদু শেখা ও চর্চার বিধান
ইসলামে জাদু শেখা, শেখানো কিংবা মানুষের ক্ষতির উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। সহিহ হাদিসে নবী করিম (সা.) সাতটি ধ্বংসাত্মক গুনাহ থেকে সতর্ক করেছেন, যার মধ্যে জাদু অন্যতম। তাই ইসলামী শরিয়তে এটি কবিরা গুনাহ হিসেবে বিবেচিত।
কালো জাদু থেকে বাঁচতে করণীয়
ইসলামী শিক্ষায় কালো জাদু থেকে নিরাপদ থাকার জন্য কিছু আমলের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- সর্বদা আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করা।
- সকাল-সন্ধ্যার মাসনুন জিকির নিয়মিত আদায় করা।
- সুরা আল-ইখলাস, সুরা আল-ফালাক ও সুরা আন-নাস তিনবার করে সকাল-সন্ধ্যায় পাঠ করা।
- নিয়মিত আয়াতুল কুরসি তেলাওয়াত করা।
- ঘুমানোর আগে তিন কুল পড়ে শরীরে ফুঁ দেওয়া।
- সূরা আল-বাকারার শেষ দুই আয়াত পাঠ করা।
- সর্বদা পবিত্রতা বজায় রাখার চেষ্টা করা এবং ফরজ-ওয়াজিব ইবাদতে যত্নবান হওয়া।
কুসংস্কার নয়, আল্লাহর ওপর ভরসা
ইসলাম জাদুর অস্তিত্ব অস্বীকার করে না, তবে এটিকে মানুষের জন্য একটি পরীক্ষা হিসেবে উল্লেখ করে। একই সঙ্গে জাদুকর, তান্ত্রিক বা ভণ্ড কবিরাজের শরণাপন্ন হওয়া এবং তাদের কথায় বিশ্বাস করা থেকে কঠোরভাবে বিরত থাকতে নির্দেশ দেয়।
কোনো ব্যক্তি যদি জাদুর আশঙ্কা করেন, তাহলে কোরআন-সুন্নাহভিত্তিক দোয়া, রুকইয়াহ ও জিকিরের আমল করা এবং প্রয়োজনে বিশ্বস্ত ও কোরআন-সুন্নাহর অনুসারী আলেমের পরামর্শ নেওয়াই ইসলামের নির্দেশনা।
ইসলামী শিক্ষার মূল বার্তা হলো—সব ধরনের ভয়, বিপদ ও অনিষ্ট থেকে রক্ষাকারী একমাত্র আল্লাহ। তাই একজন মুমিনের প্রকৃত আশ্রয় হবে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল, নিয়মিত ইবাদত এবং কোরআন-সুন্নাহর নির্দেশনা অনুসরণ।
আরু/


