রাজধানীর গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে সংঘটিত দেশের ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ জঙ্গি হামলার ১০ বছর পূর্ণ হলো আজ, ১ জুলাই। ২০১৬ সালের এই দিনে সংঘটিত নৃশংস হামলায় ১৭ জন বিদেশি নাগরিকসহ মোট ২২ জন নিহত হন। এক দশক পেরিয়ে গেলেও বহুল আলোচিত এই মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া এখনো চূড়ান্ত হয়নি। বর্তমানে মামলাটি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।
হামলার ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় ২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল ‘নব্য জেএমবি’-র সাত সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড দেন। পরে ২০২৩ সালের ৩০ অক্টোবর হাইকোর্ট আইনি ব্যাখ্যার ভিত্তিতে সেই রায় সংশোধন করে সাত আসামির মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে আমৃত্যু কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেন।
২০২৫ সালের ১৮ জুন হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হওয়ার পর সাজাপ্রাপ্ত সাতজনের মধ্যে ছয়জন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল করেছেন। অপর আসামি আসলাম হোসেন ওরফে র্যাশ ২০২৫ সালের ৬ জুন কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কারাগারে কারারক্ষীদের গুলিতে নিহত হওয়ায় তার আপিলের প্রশ্ন আর থাকছে না।
নবনিযুক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক গুরুত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তার বিষয় বিবেচনায় রাষ্ট্রপক্ষ মামলাটির দ্রুত শুনানির উদ্যোগ নেবে।
প্রতিবছর ১ জুলাই গুলশানে নিহতদের স্মরণে পুলিশ ও বিভিন্ন বিদেশি দূতাবাসের উদ্যোগে আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হলেও, এবার দৃশ্যপট ভিন্ন।
হামলা প্রতিরোধে প্রাণ হারানো দুই পুলিশ কর্মকর্তার স্মরণে গুলশান থানার সামনে নির্মিত ‘দীপ্ত শপথ’ ভাস্কর্যটি ২০২৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় ভেঙে ফেলা হয়। এখনো সেটি পুনর্নির্মাণ হয়নি।

ঢাকা মহানগর পুলিশের গুলশান বিভাগের উপ-কমিশনার এম তানভীর আহমেদ জানিয়েছেন, পুলিশের পক্ষ থেকে এবার আলাদা কোনো কর্মসূচি রাখা হয়নি। তবে ঢাকায় অবস্থানরত বিভিন্ন দেশের দূতাবাসের সমন্বয়ে ইতালি দূতাবাসে একটি সীমিত পরিসরের স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
হলি আর্টিজান হামলার দশম বার্ষিকীতে নতুন করে আলোচনায় এসেছে দেশে জঙ্গিবাদের বর্তমান অবস্থা।
বর্তমান প্রশাসনের কয়েকজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি দাবি করেছেন, দেশে এখন জঙ্গিবাদের অস্তিত্ব নেই। সাবেক পুলিশ কমিশনার শেখ সাজ্জাত আলী এক বক্তব্যে বলেন, বর্তমানে জঙ্গির চেয়ে ছিনতাই বড় সমস্যা এবং অতীতে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে জঙ্গিবাদের বিষয়টি ব্যবহার করা হয়েছিল।
একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ। চলতি বছরের এপ্রিল মাসে তিনি বলেন, তিনি “জঙ্গি” শব্দটিকেই স্বীকৃতি দেন না এবং বর্তমানে দেশে এমন কোনো অস্তিত্ব নেই।
তবে সরকারের তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান ভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশে একসময় জঙ্গিবাদ ছিল এবং এখনো কিছু ঝুঁকি রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে উগ্রবাদী প্রবণতার কিছু মানুষের সংগঠিত হওয়ার লক্ষণ দেখা গেছে, যা গুরুত্বের সঙ্গে মোকাবিলা করা প্রয়োজন।

২০১৬ সালের ১ জুলাই শুক্রবার রাতে গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলা চালায় নব্য জেএমবির পাঁচ সদস্য—রোহান ইবনে ইমতিয়াজ, মীর সামেহ মোবাশ্বের, নিবরাস ইসলাম, শফিকুল ইসলাম উজ্জ্বল ও খায়রুল ইসলাম পায়েল।
রাতভর জিম্মি করে রাখা অবস্থায় হামলাকারীরা ৯ জন ইতালীয়, ৭ জন জাপানি, ১ জন ভারতীয়, ১ জন বাংলাদেশি-আমেরিকান এবং ২ জন বাংলাদেশি নাগরিককে হত্যা করে। হামলার শুরুতে গুলিতে নিহত হন পুলিশের দুই কর্মকর্তা।
পরদিন সকালে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে পরিচালিত ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’-এ মাত্র ১২ মিনিটের অভিযানে পাঁচ হামলাকারী নিহত হয় এবং জিম্মি সংকটের অবসান ঘটে।
এক দশক পরও অপেক্ষা
হলি আর্টিজান হামলা বাংলাদেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ইতিহাসে একটি বড় মোড় পরিবর্তনের ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়। হামলার পর সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে ব্যাপক পরিবর্তন এলেও, ঘটনার বিচার এখনো চূড়ান্ত হয়নি। একই সঙ্গে দেশে জঙ্গিবাদের বর্তমান বাস্তবতা নিয়ে সরকার ও প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে ভিন্নমুখী বক্তব্য নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
দশ বছর পরও তাই হলি আর্টিজান শুধু একটি মর্মান্তিক স্মৃতি নয়; এটি বিচার, নিরাপত্তা ও উগ্রবাদ মোকাবিলায় বাংলাদেশের সামনে থাকা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোরও প্রতীক হয়ে রয়েছে।
আরু/


