ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে দুর্নীতিবাজদের জমানো অপ্রদর্শিত অর্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ফিরিয়ে আনা, মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ এবং কালো টাকার প্রবাহ কমাতে দেশে প্রচলিত ৫০০ ও ১,০০০ টাকার নোট বাতিলের প্রস্তাব দিয়েছেন সরকারদলীয় সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন।
রোববার (২৮ জুন) জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এ প্রস্তাব দেন। একই সঙ্গে তিনি দেশের ব্যাংকিং খাত পুনর্গঠনের লক্ষ্যে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত ব্যাংকের সংখ্যা কমানোরও আহ্বান জানান।
সংসদে দেওয়া বক্তব্যে মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, বর্তমানে অনেক মানুষ ব্যাংকে অর্থ জমা না রেখে বাসাবাড়িতে নগদ টাকা সংরক্ষণ করছেন। এছাড়া দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া অনেক ব্যক্তিও বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ রেখে গেছেন। এ অবস্থায় সরকার যদি ৫০০ ও ১,০০০ টাকার নোট এক থেকে দুই মাসের মধ্যে ব্যাংকে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেয়, তাহলে বিপুল পরিমাণ অর্থ আবার ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ফিরে আসবে।
তিনি বলেন, যেসব ব্যক্তি অর্থের বৈধ উৎস দেখাতে পারবেন না, তাদের নির্দিষ্ট হারে—২০ থেকে ২৫ শতাংশ—কর দিয়ে সেই অর্থ বৈধ করার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। এতে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়বে, ব্যাংকে তারল্য বৃদ্ধি পাবে, বিনিয়োগে গতি আসবে এবং অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ বাড়বে।
ব্যাংকিং খাত নিয়ে সমালোচনা করে তিনি বলেন, দেশে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি ব্যাংক রয়েছে। “এমপি হলেই একটা ব্যাংক, নেতা হলেই একটা লিজিং কোম্পানি”—এ ধরনের সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। দুর্বল ব্যাংক টিকিয়ে রাখতে জনগণের অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাই ব্যাংকের সংখ্যা কমিয়ে খাতটিকে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর করার আহ্বান জানান তিনি।
অর্থ পাচারের প্রসঙ্গ তুলে মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার কথা বহুবার বলা হলেও বাস্তবে উল্লেখযোগ্য সাফল্য আসেনি। তার মতে, মানুষ যেখানে অর্থ নিরাপদ মনে করে, সেখানেই অর্থ নিয়ে যায়। তাই শুধু পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারের উদ্যোগ নয়, দেশে এমন একটি আর্থিক ও আইনি পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে, যাতে মানুষ স্বেচ্ছায় দেশের ভেতরেই বিনিয়োগ ও অর্থ সংরক্ষণে আস্থা পায়।
তিনি বলেন, বর্তমান বাজেট কঠিন অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে প্রণয়ন করা হয়েছে। এতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড এবং যুবকদের প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের বিভিন্ন উদ্যোগ রাখা হয়েছে। তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ও অর্থনীতিকে সচল রাখতে কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন বলেও তিনি মত দেন।
মাহবুব উদ্দিন খোকনের এই প্রস্তাবের সঙ্গে ভারতের ২০১৬ সালের বহুল আলোচিত নোট বাতিলের সিদ্ধান্তের মিল রয়েছে। ওই বছরের ৮ নভেম্বর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আকস্মিকভাবে দেশটির প্রচলিত ৫০০ ও ১,০০০ রুপির নোটের আইনগত বৈধতা বাতিলের ঘোষণা দেন। সে সময় ওই দুটি নোট ভারতের মোট প্রচলিত নগদ অর্থের প্রায় ৮৬ শতাংশ ছিল।
যদিও ওই সিদ্ধান্তের উদ্দেশ্য ছিল কালো টাকা, জাল নোট ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন দমন, পরবর্তীতে এ নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়। অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করেন, এতে ডিজিটাল লেনদেন সাময়িকভাবে বাড়লেও অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায় বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হয়েছিল।
অন্যদিকে সরকার দাবি করেছিল, করদাতার সংখ্যা বৃদ্ধি এবং আর্থিক ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনতে এ উদ্যোগ ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে।
বাংলাদেশে নোট বাতিলের বিষয়ে এখন পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত বা আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়নি। মাহবুব উদ্দিন খোকনের প্রস্তাবটি সংসদীয় আলোচনার অংশ হিসেবে উত্থাপিত হয়েছে।
আরু/


