বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ‘সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।’ কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা কি সংবিধানের এই মৌলিক অঙ্গীকারকে প্রতিফলন করছে? সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া দুটি ভিন্নধর্মী ঘটনা আমাদের সামনে এক বড় প্রশ্নচিহ্ন দাঁড় করিয়ে দিয়েছে—বিচার কি আসলেই সবার জন্য সমান? নাকি বিচারব্যবস্থায় রয়ে গেছে অদৃশ্য কোনো দেয়াল?
সাম্প্রতিক সময়ে সরকার আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বেশ কিছু সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছে। ঈদের ঠিক আগে রাজধানীর আদ-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কঠোর অবস্থান দেশজুড়ে আলোচনার সৃষ্টি করেছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় তদন্ত শেষে হাসপাতালটির লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে, যা বেসরকারি হাসপাতালগুলোর স্বেচ্ছাচারিতা রোধে একটি সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
একইভাবে, পল্লবীর সাত বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় মাত্র ছয় দিনের মধ্যে আসামিদের মৃত্যুদণ্ডের রায় প্রদানের ঘটনাটি বিচারিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। দ্রুততম সময়ে এই রায় প্রদান করে সরকার প্রমাণ করেছে যে, সদিচ্ছা থাকলে ন্যায়বিচার পাওয়া অসম্ভব নয়। এই ঘটনাগুলো আইনের শাসন ও বিচারব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা ফেরাতে বড় ভূমিকা রাখছে।
কিন্তু একদিকে যখন এই অপরাধীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে হামে আক্রান্ত হয়ে ৬ শতাধিক শিশুর মৃত্যুর ঘটনাটি এখনো এক বড় রহস্য ও বেদনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকের মতে, এটি কোনো সাধারণ স্বাস্থ্য সমস্যা ছিল না, বরং তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের চরম অবহেলা ও অব্যবস্থাপনারই প্রতিফলন।
ইউনিসেফের তথ্যমতে, টিকা-সংকট নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে অন্তত পাঁচটি চিঠি ও ১০টি বৈঠক মারফত সতর্ক করা হয়েছিল।
অভিযোগ রয়েছে, টিকা ক্রয়প্রক্রিয়ায় অহেতুক পরিবর্তনের ফলে সময়মতো টিকা দেশে না আসায় এই অকাল মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হয়েছে। ভুক্তভোগী অভিভাবক ও সচেতন মহলের প্রশ্ন—৬ শিশুর মৃত্যুর জন্য যদি হাসপাতাল দায়ী হতে পারে, তবে ৬০০ শিশুর মৃত্যুর জন্য রাষ্ট্রীয় কর্তাব্যক্তিদের দায় থাকবে না কেন?
এই হত্যাকাণ্ডের বিচার চেয়ে জনস্বার্থে মামলা করার উদ্যোগ নিলেও তা বারবার বাধার সম্মুখীন হয়েছে। কিশোরগঞ্জ-৫ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য শেখ মজিবুর রহমান ইকবালসহ অনেকে মামলা করতে চাইলেও আদালত তা গ্রহণ করেনি। যদিও হাইকোর্ট এই মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানে একটি ইনকোয়ারি কমিশন গঠন কেন করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন, তবুও এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ বা নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠিত হয়নি।
বর্তমান সরকার বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে সাবেক সরকারের অবহেলার দিকে আঙুল তুললেও, এই বিপর্যয় নিয়ে এখনো কোনো পূর্ণাঙ্গ নিরপেক্ষ তদন্তের উদ্যোগ দেখা যায়নি। অথচ শিশু মৃত্যুর মতো সংবেদনশীল ঘটনায় রাষ্ট্রের নীরবতা বা নিষ্ক্রিয়তা জনমনে ক্ষোভের সৃষ্টি করছে।
আইনের শাসন মানে কেবল শক্তিশালী বা সুবিধাভোগীদের বিচার করা নয়, বরং প্রতিটি নাগরিকের জীবনের মূল্য নিশ্চিত করা। আদ-দ্বীন হাসপাতালের ক্ষেত্রে সরকার যে সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছে, সেই একই সাহসিকতা হামে মৃত ৬ শতাধিক শিশুর ক্ষেত্রেও প্রত্যাশিত।
বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে, ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে যারা অতীতে পার পেয়ে গেছেন, তাদের বিচারের আওতায় আনতেই হবে। নতুবা, আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হবে। ৬০০ শিশুর এই অকাল মৃত্যু কোনো পরিসংখ্যান নয়, এটি একটি জাতীয় ট্র্যাজেডি—আর এই ট্র্যাজেডির দায়ীদের খুঁজে বের করা বর্তমান সরকারের নৈতিক দায়িত্ব।
জনগণ এখন কেবল আশ্বাস নয়, দেখতে চায় স্বচ্ছ তদন্ত এবং দৃষ্টান্তমূলক বিচার।
আরু/


