দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) মডেলে ভোলা-বরিশাল ও শরীয়তপুর-চাঁদপুর এই দুটি মেগা সেতু নির্মাণে আগ্রহ প্রকাশ করেছে জাপানের নির্মাণ প্রতিষ্ঠান মিয়াগাওয়া কেনসেৎসু কনস্ট্রাকশন লিমিটেড। দুই প্রকল্পের মোট সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৩ হাজার ৪২৩ কোটি টাকা (প্রায় ৩.৪৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার)।
৮ম বাংলাদেশ-জাপান যৌথ পিপিপি প্ল্যাটফর্ম বৈঠকে প্রতিষ্ঠানটি আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের আগ্রহের কথা জানায়। বৈঠকে দুটি সেতু প্রকল্পকে বাংলাদেশ-জাপান যৌথ পিপিপি প্ল্যাটফর্মের আওতায় নতুন প্রকল্প হিসেবে অনুমোদন দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ ও পিপিপি কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ভূমি অধিগ্রহণের ব্যয় বাংলাদেশ সরকার বহন করবে। প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে লেনদেন উপদেষ্টা নিয়োগ করা হবে। এরপর ‘রিকোয়েস্ট ফর প্রপোজাল (RFP)’ আহ্বান করে চূড়ান্ত বিনিয়োগকারী নির্বাচন করা হবে।
ভোলা-বরিশাল সেতু হবে দেশের দীর্ঘতম
দুটি প্রকল্পের মধ্যে সবচেয়ে বড় হলো ভোলা-বরিশাল সেতু। প্রায় ১০.৮৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সেতুর সম্ভাব্য ব্যয় ১৭ হাজার ৪৬৬ কোটি টাকা। এটি নির্মিত হলে ভোলা দ্বীপের সঙ্গে বরিশালের সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপিত হবে এবং এটি হবে বাংলাদেশের দীর্ঘতম সেতু।
২০২৪ সালের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা অনুযায়ী, সেতুটি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আগামী ৩০ বছরে জাতীয় জিডিপিতে প্রায় ০.৮৬ শতাংশ অবদান রাখতে পারে। একই সঙ্গে ভোলার প্রাকৃতিক গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ২০৩৩ সালের মধ্যে সেতুটির নির্মাণ শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
শরীয়তপুর-চাঁদপুর সেতু কমাবে ৯০ কিলোমিটার পথ
মেঘনা নদীর ওপর ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ শরীয়তপুর-চাঁদপুর সেতুর সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১৫ হাজার ৯৫৭ কোটি টাকা।
চাঁদপুরের হরিনা ফেরিঘাট থেকে শরীয়তপুরের সখিপুর পর্যন্ত নির্মিতব্য এই সেতু দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলার সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ১১টি জেলার সরাসরি সংযোগ স্থাপন করবে। এতে খুলনা ও চট্টগ্রামের মধ্যে সড়কপথের দূরত্ব প্রায় ৯০ কিলোমিটার কমবে এবং ঢাকার ওপর যানবাহনের চাপও হ্রাস পাবে। প্রকল্পটি ২০৩২ সালের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
ভোলা-লক্ষ্মীপুর সেতুতেও জাপানের আগ্রহ
বৈঠকে ভোলা-লক্ষ্মীপুর সেতু প্রকল্পও জাপানের কাছে উপস্থাপন করা হয়। জাপান এটিকে দক্ষিণাঞ্চলের আঞ্চলিক সংযোগ, বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হিসেবে উল্লেখ করে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মেঘনা নদীর ওপর এই সেতু নির্মিত হলে খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের মোট ২১টি জেলার মানুষের যাতায়াতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে।
দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের অংশগ্রহণ
বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এবিএম আবদুস সাত্তার, পিপিপি অথরিটির সিইও আশিক চৌধুরী এবং প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ড. মো. শাকিরুল ইসলাম খান।
জাপানের পক্ষে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ উপদেষ্টা উনো ইয়োশিমাসা, বাংলাদেশে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনিচি, জাপানের ভূমি, অবকাঠামো, পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের (MLIT) সহকারী উপমন্ত্রী ফুজিতা মাসাকুনি এবং আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলবিষয়ক সহকারী উপমন্ত্রী নাকায়ামা রেইকো।
আরও যেসব বিষয়ে আলোচনা
বৈঠকে চট্টগ্রামে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ (Waste-to-Energy) প্রকল্পকে যৌথ পিপিপি প্ল্যাটফর্মে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দেয় জাপান। এছাড়া জাপানের কারিগরি সহায়তায় বাংলাদেশের পুরোনো রেলসেতুগুলো আধুনিকীকরণের বিষয়েও আলোচনা হয়।
একই সঙ্গে কমলাপুর মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্ট হাব, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের টার্মিনাল-৩ পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ, আউটার রিং রোড এবং স্থানীয় সেতু উন্নয়নসহ বিভিন্ন চলমান অবকাঠামো প্রকল্পের অগ্রগতিও পর্যালোচনা করা হয়।
বৈঠক শেষে পিপিপি অথরিটির সিইও আশিক চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশ-জাপান যৌথ পিপিপি প্ল্যাটফর্ম এখন বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়ন ও উচ্চমানের বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের একটি নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে, মুখ্য সচিব এবিএম আবদুস সাত্তার প্ল্যাটফর্মটির প্রতি সরকারের পূর্ণ সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, দুই দেশ যোগাযোগ উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যে সহযোগিতা আরও জোরদার করবে।
আরু/


