জাতীয় সংসদে একাধিক সংশোধনী যুক্ত করে অর্থবিল-২০২৬ পাস হয়েছে। বিলে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বাতিল, ব্যক্তির করমুক্ত আয়সীমা ৪ লাখ টাকা নির্ধারণ এবং ব্যাংক হিসাব খুলতে টিআইএন নম্বরের বাধ্যবাধকতা তুলে নেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে।
সোমবার জাতীয় সংসদে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অধিবেশনে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিলটি চূড়ান্ত পাসের জন্য উত্থাপন করলে কণ্ঠভোটে তা অনুমোদিত হয়।
বিলটি পাসের আগে সংসদ সদস্যদের জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাব এবং সাধারণ নীতির ওপর দীর্ঘ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানাসহ কয়েকজন সদস্য বিশাল বাজেট ঘাটতি, কর ও ভ্যাটের চাপ, ব্যাংকিং খাতের দুর্নীতি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের ব্যবস্থাপনা এবং বৈদেশিক ঋণসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন তুলে বিলটি অধিকতর যাচাইয়ের দাবি জানান।
দীর্ঘ আলোচনা শেষে কয়েকটি সংশোধনী যুক্ত করে অর্থবিলটি চূড়ান্তভাবে পাস করা হয়।
পাস হওয়া অর্থবিলে কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ সম্পূর্ণ বাতিল করা হয়েছে। পাশাপাশি ব্যক্তির করমুক্ত আয়সীমা ৪ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে আর টিআইএন নম্বর বাধ্যতামূলক থাকছে না।
বাজেটের ওপর সমাপনী বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বর্তমান সরকার দুর্বল অর্থনীতি ও ভঙ্গুর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো উত্তরাধিকার হিসেবে পেলেও টেকসই প্রবৃদ্ধির ব্যাপারে আশাবাদী। তিনি বলেন, সরকার ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে ধীরে ধীরে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতির দিকে অগ্রসর হচ্ছে, যেখানে বেসরকারি উদ্যোগ, উদ্ভাবন ও কর্মসংস্থান হবে প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি।
তিনি আরও বলেন, বাজেট শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; এটি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার একটি রূপরেখা।
অর্থমন্ত্রী জানান, চলতি অর্থবছরে প্রথমবারের মতো জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর আদায় ৪ লাখ কোটি টাকা অতিক্রম করেছে
আগামী অর্থবছরে উন্নয়ন ব্যয়ের অংশ বাড়িয়ে মোট বাজেটের ৩৩ দশমিক ৭ শতাংশে উন্নীত করা হবে, যা চলতি অর্থবছরে ছিল ২৭ দশমিক ২৭ শতাংশ। একই সঙ্গে পরিচালন ব্যয় ৭২ দশমিক ৭৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬৬ দশমিক ৩ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২১ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা, যা দেশের মোট জিডিপির ৩৮ দশমিক ৬১ শতাংশ। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণ ১১ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণ ৯ লাখ ৪৯ হাজার কোটি টাকা।
ঋণনির্ভরতা কমাতে আগামী অর্থবছরে ব্যাংকঋণ ৬ হাজার কোটি টাকা কমানো, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তি এবং বন্ড ও ইকুইটি ফাইন্যান্সিং সম্প্রসারণের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে হংকং, লন্ডন ও নিউইয়র্কে বেসরকারি বিনিয়োগ তহবিল গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, আর্থিক অপরাধ দমনে সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত ১১টি অগ্রাধিকার মামলায় দেশ-বিদেশে মোট ৭২ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকার সম্পদ জব্দ বা স্থগিত করা হয়েছে।
পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে ১৩টি দেশে ২৩টি মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স (এমএলএ) অনুরোধ পাঠানো হয়েছে। মালয়েশিয়া ও হংকংয়ের সঙ্গে এ-সংক্রান্ত চুক্তিও চূড়ান্ত হয়েছে।
এ ছাড়া ছয়টি বড় ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনি কার্যক্রম শুরু হয়েছে এবং ১৫টির বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংক আন্তর্জাতিক সম্পদ পুনরুদ্ধারকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ৬০টির বেশি গোপনীয়তা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী।
আরু/


