বাংলাদেশ থেকে কাঁঠাল আমদানির জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে আগ্রহ দেখিয়েছে চীন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফরে দুই দেশের মধ্যে কাঁঠাল রপ্তানি সংক্রান্ত একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হওয়ায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের কৃষিপণ্য রপ্তানিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে।
এর আগে ২০২৫ সালের মে মাসে বাংলাদেশ থেকে প্রথমবারের মতো কাঁচা আম আমদানি শুরু করার সময়ও চীন কাঁঠাল ও পেয়ারাসহ আরও কয়েকটি ফল আমদানির আগ্রহ প্রকাশ করেছিল। সাম্প্রতিক সফরে অবকাঠামো, ডিজিটাল অর্থনীতি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাসহ মোট ১৭টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে, যার মধ্যে কাঁঠাল রপ্তানির বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন জানিয়েছেন, বাংলাদেশ-চীন বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর লক্ষ্যেই কৃষিপণ্য রপ্তানিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এমওইউ স্বাক্ষরের মাধ্যমে কাঁঠাল রপ্তানির আনুষ্ঠানিক পথ অনেকটাই সুগম হয়েছে।
-
কেন কাঁঠালে আগ্রহী চীন?
বিশ্বের সবচেয়ে বড় কাঁঠাল আমদানিকারক দেশ চীন। দেশটির বিশাল বাজারের চাহিদার বড় অংশ বর্তমানে ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ড থেকে পূরণ করা হয়। তবে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, উৎপাদন সক্ষমতা এবং প্রতিযোগিতামূলক মূল্যের কারণে নতুন উৎস হিসেবে বাংলাদেশকে গুরুত্ব দিচ্ছে চীন।
বিশ্ববাজারে কাঁঠালের চাহিদাও দ্রুত বাড়ছে। ২০১২ সালে যেখানে বৈশ্বিক কাঁঠাল বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ২০০ কোটি মার্কিন ডলার, ২০২৩ সালে তা বেড়ে প্রায় ৩৭০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। বর্তমানে ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, চীন ও ইকুয়েডর মিলেই বিশ্ব কাঁঠাল রপ্তানির প্রায় ৬০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে।
-
উৎপাদনে এগিয়ে, রপ্তানিতে পিছিয়ে বাংলাদেশ
বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম প্রধান কাঁঠাল উৎপাদনকারী দেশ। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিবছর আট থেকে ১০ লাখ টন কাঁঠাল উৎপাদিত হয়। তবে অভ্যন্তরীণ চাহিদা সীমিত এবং রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ না হওয়ায় উৎপাদিত কাঁঠালের ৪৫ শতাংশেরও বেশি প্রতিবছর নষ্ট হয়ে যায়।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক কাঁঠাল রপ্তানিতে বাংলাদেশের অংশ মাত্র ০.৩ শতাংশ। বর্তমানে দেশের অধিকাংশ কাঁঠাল যুক্তরাজ্যের প্রবাসীকেন্দ্রিক বাজারে রপ্তানি হয়। এছাড়া ইতালি, কানাডা ও ফ্রান্সেও কিছু পরিমাণ কাঁঠাল যায়।
-
অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা
কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, চীনের মতো বৃহৎ বাজারে কাঁঠাল রপ্তানি শুরু হলে দেশের কৃষি অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। শুধু কাঁঠাল নয়, অন্যান্য ফল ও কৃষিপণ্যের জন্যও নতুন বাজার তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হবে। এর ফলে কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনও বাড়বে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি ও গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ডিন ড. মোহাম্মদ আমিরুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের কৃষিপণ্য রপ্তানির বড় অংশ এখনো প্রবাসীকেন্দ্রিক বা এথনিক মার্কেটের ওপর নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক মূলধারার বাজারে প্রবেশ করতে হলে পণ্যের মান, নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নিশ্চিত করতে হবে।
-
সামনে যেসব চ্যালেঞ্জ
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু উৎপাদন বাড়ালেই হবে না; আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকতে হলে সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেজিং এবং কোল্ড-চেইন ব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি।
বাংলাদেশ অ্যাগ্রো-বেজড প্রোডাক্ট প্রডিউসারস অ্যান্ড মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ রুহুল আমিন বলেন, কাঁঠাল সংরক্ষণ ও দীর্ঘ দূরত্বে পরিবহনে প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তাই রপ্তানি বাড়াতে আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণ অবকাঠামো গড়ে তোলার বিকল্প নেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারের বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কৃষিপণ্যের আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করা এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বাংলাদেশ চীনের বিশাল বাজারে উল্লেখযোগ্য অবস্থান তৈরি করতে পারে।
তবে তারা সতর্ক করে বলেছেন, রপ্তানির পাশাপাশি দেশের মানুষের পুষ্টি চাহিদার বিষয়টিও সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে, যাতে অতিরিক্ত রপ্তানির কারণে স্থানীয় বাজারে সংকট সৃষ্টি না হয়।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের বিশ্বাস, যথাযথ পরিকল্পনা, মান নিয়ন্ত্রণ এবং আধুনিক সরবরাহ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে চীনে কাঁঠাল রপ্তানি বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতির জন্য একটি যুগান্তকারী সুযোগ হয়ে উঠতে পারে।
আরু/


