দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সর্ববৃহৎ চামড়ার মোকাম রাজারহাটে এবার সিন্ডিকেটের নতুন কারসাজি ‘করোনা’ আর ‘পক্স’! গরু লাম্পি স্কিন রোগে আক্রান্ত ছিল দাবি করে ‘করোনা’ আর ‘পক্স’ ট্যাগ লাগিয়ে বাতিল দেখিয়ে পানির দামে বিক্রি হচ্ছে চামড়া। এতে যশোরের রাজাহাটে চামড়া ব্যবসায় ধস নেমেছে।
শনিবার (৩০ মে) কোরবানি ঈদ পরবর্তী প্রথম হাটে দাম না পেয়ে মাথায় হাত উঠেছে মৌসুমি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের।
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বলছেন, ঈদ পরবর্তী প্রথম হাটে ট্যানারি মালিক বা বাইরের বড় ব্যবসায়ীরা না আসায় নামমাত্র মূল্যে চামড়া বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। লাম্পি স্কিন, করোনা, পক্স— এসব বলে চামড়া বাতিল দেখিয়ে পানির দামে চামড়া কিনছেন স্থানীয় আড়তদাররা। সিন্ডিকেট আর কারসাজি করে তারা চামড়ার দাম কমিয়ে দিয়েছেন।
তবে আড়তদের দাবি, লাম্পি স্কিন আক্রান্ত গরুর চামড়া প্রসেসিং করার সময় ফেটে যায়। ফলে ট্যানারি মালিকরা নিতে চান না। এজন্য এই চামড়ার দাম নেই। তবে ভালো চামড়া ভালো দামে বিক্রি হচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা জানান, খুলনা বিভাগের সবচেয়ে বড় ও দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম চামড়ার বাজার যশোরের রাজারহাট। ঢাকার পরে দেশের অন্যতম বৃহত্তর চামড়ার মোকাম এটি। এই মোকামে তিন শতাধিক আড়ত রয়েছে। সপ্তাহে দুদিন শনি ও মঙ্গলবার এখানে হাট বসে। এখানে খুলনা বিভাগের ১০ জেলা ছাড়াও ফরিদপুর, রাজশাহী, পাবনা, নাটোর এবং ঢাকার বড় বড় ব্যবসায়ীরা চামড়া বেচাকেনা করেন। এই হাট ঘিরে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় ১০ হাজার ছোট-বড় ব্যবসায়ী ব্যবসা করেন। প্রতিবছর কোরবানির ঈদ ঘিরে কয়েকটি হাটে রাজারহাটে প্রায় শতকোটি টাকার চামড়া বেচাকেনা হয়।
শনিবার ছিল কোরবানি ঈদ-পরবর্তী প্রথম হাট। তবে কোরবানি ঈদের একদিন পরেই এই হাট বসায় চামড়ার আমদানি ছিল তুলনামূলক বেশ কম। বাজারেও মন্দাভাব।
রাজারহাট ঘুরে দেখা গেছে, ক্ষুদ্র ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা স্থানীয় পরিবহনে করে চামড়া এনে স্তূপ করে রেখেছেন। স্থানীয় আড়তদাররা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের স্তূপ করা চামড়া উল্টে-পাল্টে দেখছেন। দাম নিয়ে চলছে দুপক্ষের দর কষাকষি।
আড়তদারদের দামে হতাশা প্রকাশ করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বলছেন, হাটে কোরবানির পশুর চামড়ার যে দাম, তাতে তারা পুঁজি হারাতে বসেছেন।
তাদের দাবি, আড়তদার ও ব্যবসায়ীরা চামড়ার দু-একটি স্পট দেখিয়েই দাবি করছেন গরু লাম্পি স্কিন রোগে আক্রান্ত ছিল। এই চামড়া করোনা, পক্স আক্রান্ত দাবি করে ২০০-৩০০ টাকা দাম বলছেন। সরকার নির্ধারিত দামের তুলনায় অনেক কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে কোরবানির পশুর চামড়া। মূলত ট্যানারি মালিক-আড়তদারদের সিন্ডিকেট এই চামড়ার দাম নিয়ন্ত্রণ করছে। ফলে তারা পুঁজি নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারছেন না।
খুলনার বটিয়াঘাটা থেকে রাজারহাটে চামড়া নিয়ে এসেছিলেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী স্বপন দাস। তিনি জানালেন, ৫০ পিস চমড়া নিয়ে এসেছেন। এলাকা থেকে তিনি ৩০০-৩৫০ টাকা দরে এই চামড়া কিনেছেন। কিন্তু দুপুর পর্যন্ত কোনো ব্যাপারি, আড়তদার দামই বলেননি।
স্বপন দাস বলেন, ‘আড়তদাররা কচ্চে (বলছে), চামড়ার করোনা হয়েছে। আমি তো বাপু করোনা বুজদিচিনে (বুঝতে পারছি না)। কিন্তু কেউ দামও কচ্চে না।’
মাগুরার ভাঙ্গুরা থেকে চামড়া নিয়ে আসা মহানন্দ অধিকারীও একই কথা জানালেন। তারও ভাষ্য, চামড়ার দাম পাচ্ছেন না।
মণিরামপুর উপজেলার ফকির রাস্তা এলাকা থেকে ৬০ পিস গরুর চামড়া নিয়ে হাটে এসেছিলেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী স্বদেশ দাস। তিনি জানালেন, গড়ে তিনি চামড়াগুলো ৩০০-৩৫০ টাকায় কিনেছেন। এখন আড়তদাররা ২০০ টাকা দাম বলছেন। লাম্পি স্কিন, করোনা, পক্স—এসব বলে চামড়া বাতিল বলছেন।
চামড়ার দরদাম করছিলেন বৃহত্তর যশোর জেলা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সহসভাপতি গিয়াস উদ্দিন। তিনি জাগো নিউজের কাছে দাবি করেন, হাটে অনেক লাম্পি স্কিন, পক্স আক্রান্ত গরুর চামড়া উঠেছে। মৌসুমি বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা এই চামড়া না চিনেই বেশি দামে কিনেছেস। এতে তারা ধরা খেয়েছেন। এসময় তিনি চামড়ার ছোট ছোট দু-একটি স্পটও শনাক্তের চেষ্টা করেন।
যশোরের কেশবপুর থেকে চামড়া বিক্রি করতে আসা সঞ্জয় দাস জাগো নিউজক বলেন, ‘বাজার বুঝতে আটটি গরুর চামড়া নিয়ে এসেছি। আটটি চামড়া মাত্র ১২০০ টাকায় বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছি। অথচ চামড়া কেনাই পড়েছে ৩০০ টাকা পিস। এর সঙ্গে লবণ খরচ রয়েছে। চামড়া কিনে তো আমার লস হয়ে গেল।’
অভয়নগর উপজেলার কোটাপাড়া থেকে রাজারহাটে গরু ও ছাগলের চামড়া নিয়ে এসেছিলেন রামপদ দাস। তিনি গড়ে ৩০০ টাকা দরে ২৫টি গরুর চামড়া এবং ৩৫ টাকা দরে ৪০টি ছাগলের চমড়া কিনে হাটে এসেছেন। এর মধ্যে ২০ টাকা দরে ছাগলের চামড়া বিক্রি করেছেন। কিন্তু গরুর চামড়া বিক্রি হচ্ছে না।
সিন্ডিকেটের সঙ্গে নতুন কারসাজির নাম ‘করোনা-পক্স’!
তিনি দাবি করেন, ঢাকা ও বাইরের ব্যবসায়ীরা হাটে আসেননি। স্থানীয় আড়তদাররা ‘সিন্ডিকেট’ করে দাম কমিয়ে দিয়েছেন। তাই মাঠ পর্যায় থেকে অনেক কম দামে চামড়া কিনেও তারা পুঁজি বাঁচাতে পারছেন না।
এ বিষয়ে বৃহত্তর যশোর জেলা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোমিনুল মজিদ পলাশ বলেন, ‘হাটে লাম্পি স্কিন বা নষ্ট চামড়ার দাম কম। ভালো চামড়া ভালো দামে বিক্রি হচ্ছে।’
তিনি জানান, ঈদের দিন থেকে এ পর্যন্ত তিন হাজার চামড়া কিনেছেন। এসব চামড়া ৫০০-১১০০ টাকা দরে কেনা পড়েছে।
তবে চামড়ায় ল্যাম্পি স্কিন রোগের উপস্থিতি মানতে নারাজ যশোর সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ ফারুক হোসেন।
তিনি জানান, যশোরের বিভিন্ন পশুহাট তিনি ঘুরেছেন। হাটে ল্যাম্পি স্কিন বা অন্য কোনো রোগে আক্রান্ত পশুও তেমন দেখেননি। এছাড়া পশু কেনার সময় সবাই দেখেশুনেই কেনেন। ফলে রোগাক্রান্ত পশু তো কেউ কোরবানি করবেন না।
ফারুক হোসেন বলেন, “হাটের বেশিরভাগ চামড়া যদি বলা হয় ল্যাম্পি স্কিন, তাহলে তো তা বিশ্বাসযোগ্য নয়। এটি মূলত চমড়া ব্যবসায়ীদের ‘কারসাজি’।”
বৃহত্তর যশোর জেলা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আলাউদ্দিন মুকুল জানান, ঈদের দুদিন পরে প্রথম হাট হওয়ায় এদিন রাজারহাট জমেনি। হাট বাতিল বা অসুস্থ গরুর চামড়া ১৫০-৩০০ টাকা এবং ভালো চামড়া ৭০০-১২০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। বাইরের ব্যবসায়ীরা এলে মঙ্গল বা পরবর্তী শনিবারের হাট জমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
রাজারহাটের ইজারাদার রাজু আহমেদ জানান, শনিবারের হাটে ১০ হাজার গরুর চামড়া ও কয়েক হাজার ছাগলের চামড়ার আমদানি হয়েছে। সবমিলিয়ে ৩৫-৪০ লাখ টাকার চামড়ার বেচাকেনা হয়েছে।


