রাজধানীর মিরপুরের একটি ফ্ল্যাটের দরজা ভেঙে যখন পুলিশ ভেতরে প্রবেশ করল, তখন পুরো ঘরজুড়ে শুধু তীব্র পচনের গন্ধ আর এক ভয়াবহ নীরবতা। বিছানায় পড়ে ছিল ৭২ বছর বয়সী বৃদ্ধা নুরজাহান বেগমের নিথর দেহ। চিকিৎসকদের ধারণা, প্রায় ৭ থেকে ৮ দিন আগে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। কিন্তু এই দীর্ঘ সময়েও কেউ জানতে পারেনি তিনি আর বেঁচে নেই। এলাকাবাসীর খবরে মিরপুরের সেই ফ্ল্যাটে যখন পুলিশ ঢুকল, তখন ঘরজুড়ে শুধু পচনের গন্ধ আর এক ধরনের ভয়াবহ নীরবতা। যে নীরবতা সাধারণ কোনো নীরবতা নয়; এ যেন মানুষের বিবেককে প্রশ্নবিদ্ধ করা এবং আমাদের তথাকথিত সভ্যতার মুখোশ খুলে দেওয়া এক নির্মম বাস্তবতা। বিছানায় পড়ে ছিল ৭২ বছর বয়সী বৃদ্ধা নূরজাহান বেগমের মরদেহ। শরীরে ততক্ষণে পচন ধরেছে।
চিকিৎসকদের ধারণা, মৃত্যুর অন্তত সাত থেকে আট দিন পেরিয়ে গেছে। অথচ এই দীর্ঘ সময়ে কেউ জানতে পারেনি তিনি আর বেঁচে নেই। কেউ তাঁর খোঁজ নেয়নি, দরজায় কড়া নাড়েনি। কেউ একবারও জানতে চায়নি—“মা, কেমন আছো?”
নূরজাহান বেগম দীর্ঘদিন ধরে ওই ফ্ল্যাটে একা বসবাস করতেন। তাঁর সন্তানরা সমাজে অত্যন্ত প্রতিষ্ঠিত ও উচ্চশিক্ষিত। তাঁর বড় ছেলে এ কে এম আনিসুর রহমান (যুগ্ম সচিব), মেজো ছেলে এ কে এম আশিকুর রহমান (অধ্যাপক, সিএসই বিভাগ, বুয়েট) এবং একমাত্র মেয়ে স্থানীয় একটি স্কুলের শিক্ষিকা।
নিউজিল্যান্ড বা দূর প্রবাসে নয়, একই শহরে থেকেও মায়ের সঙ্গে সন্তানদের কোনো যোগাযোগ ছিল না বলে জানা গেছে।
“সন্তানের সামান্য কষ্টেও যে মায়ের রাতের ঘুম হারাম হয়ে যায়, সেই মায়ের জীবনের শেষ অধ্যায় কাটল চরম নিঃসঙ্গতায়। এটি শুধু একটি মৃত্যুর ঘটনা নয়; এটি আমাদের সমাজের মানবিক অবক্ষয়ের এক নির্মম দলিল।”
স্থানীয়দের সন্দেহের ভিত্তিতে পুলিশ দরজা ভেঙে ঘরে প্রবেশ করলে দেখা যায়, নূরজাহান বেগম বেশ কয়েক দিন আগেই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেছেন।
এই দীর্ঘ সাত দিনে সূর্য উঠেছে, সূর্য ডুবেছে। মানুষ কর্মস্থলে গেছে, পরিবার নিয়ে সময় কাটিয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যস্ত থেকেছে। কিন্তু যে মা একদিন নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন সন্তানদের জন্য, তাঁর নিথর দেহ পড়ে ছিল নীরব একটি ঘরে—হয়তো শেষবারের মতো কারও খোঁজের আশায়।
মা-বাবা কখনো সন্তানের কাছে দামি উপহার বা বিলাসবহুল জীবন চান না। তাঁরা শুধু চান একটু সময়, একটি ফোনকল, কিংবা দুটি আন্তরিক কথা।
হয়তো নূরজাহান বেগমও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বিশ্বাস করেছিলেন—কেউ একজন তাঁর খোঁজ নেবে। হয়তো দরজার দিকে তাকিয়ে থেকেছেন, ফোনের রিং শোনার অপেক্ষা করেছেন। কিন্তু সেই অপেক্ষার অবসান হয়েছে নির্মম মৃত্যুর মধ্য দিয়ে।
এই ঘটনা আজ পুরো জাতির সামনে একটি বড় প্রশ্ন চিহ্ন রেখে গেছে। কারণ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হয়তো অর্থহীন জীবন নয়; বরং সেই জীবন, যেখানে জন্মদাতা মা-বাবা বেঁচে থাকতেই চরম একাকীত্বের শিকার হন।



