মো. কামাল উদ্দিনঃ
এই ঘোষণাটি এও দাবি করে যে এই অধিকার সম্বন্ধে সদস্য দেশগুলি অবহিত থাকবে। দারিদ্র এমনই এক সামাজিক অবস্থা যা একটি দুটি নয়, সমস্ত মানবিক অধিকারকে নস্যাৎ করে দেয়। একজন দরিদ্র মানুষের জানার কোনও অধিকারই নেই সরকার কোন কাগজে সই করছেন বা কোন আমলা তার জাবদা খাতায় কী লিখছেন। সুফিয়ার দৃষ্টি দিয়ে আমি সমস্যাগুলি খতিয়ে দেখার চেষ্টা করছিলাম। নিজেকে একটি কীট হিসেবে কল্পনা করলাম আমি এবং আমার সামনে দাঁড়ানো বিপুল বাধা অতিক্রম করার পথ খুঁজলাম।
একজন কীভাবে বাঁশ কেনার খরচ জোগাড় করবে? এই বাধা অতিক্রম করার জন্য যে-কোনও পন্থায় প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। সুফিয়ার সমস্যার কোনও সমাধান আমার জানা ছিল না। তাঁর কেন এত দুর্ভোগ তা আমি সহজভাবে বুঝতে চেষ্টা করলাম। তিনি কষ্ট পাচ্ছেন কারণ বাঁশের দাম পাঁচ টাকা এবং তাঁর প্রয়োজনীয় নগদ টাকা নেই। তাঁর যন্ত্রণাময় জীবন একটা কঠিন চক্রের মধ্যে আবর্তিত হচ্ছে-মহাজনের কাছে ধার নেওয়া ও তাকেই হাতের কাজ বিক্রি করা। এই চক্র থেকে তিনি কিছুতেই মুক্তি পাচ্ছেন না। এইভাবে ভাবলে সমাধান বার করা খুবই সহজ। আমাকে শুধু তাঁকে পাঁচ টাকা ধার দিতে হবে।
এখনও পর্যন্ত তাঁর পরিশ্রম এক কথায় পারিশ্রমিকহীন। সোজা ভাষায় তিনি বেগার শ্রমিক বা ক্রীতদাস মাত্র। ব্যবসাদার বা মহাজন সবসময় চেষ্টা করছে কাঁচামালের দামের সঙ্গে যৎসামান্য পারিশ্রমিক সুফিয়াকে দিতে যাতে তিনি শুধুমাত্র মৃত্যুকে রুখতে পারবেন। কিন্তু আজীবন ধার তাঁকে করে যেতেই হবে।আমি বিবেচনা করতে শুরু করলাম সুফিয়া যদি কাজ শুরু করবার জন্য মাত্র পাঁচ টাকা হাতে না পায় তো বেগার শ্রমিক হিসেবে তাঁর ভূমিকা কোনওদিনই পালটাবে না। ঋণই একমাত্র তাঁর সেই টাকা পাবার রাস্তা। তা হলে খোলা বাজারে তাঁর তৈরি মাল বিক্রি করতে কোনও বাধা থাকবে না। কাঁচামাল ও প্রাপ্ত দামের মধ্যে গ্রহণযোগ্য লাভও থাকবে।
পরের দিন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী মাইমুনাকে ডেকে পাঠালাম। ও আমার জরিপ কাজের জন্য তথ্য সংগ্রহে সাহায্য করেছিল। জোবরা গ্রামে সুফিয়ার মতো এরকম কত জন মানুষ মহাজনের কাছে ধার নিতে বাধ্য হচ্ছে তার একটা তালিকা প্রস্তুত করতে বললাম মাইমুনাকে। এক সপ্তাহের মধ্যে তালিকা তৈরি হল। বিয়াল্লিশ জন মানুষের নাম পাওয়া গেল যাঁরা মোট ৮৫৬ টাকা ধার করেছেন। “হায় আল্লাহ, এতগুলো মানুষের জীবনে এত দুর্দশা মাত্র ৮৫৬ টাকার অভাবে।” মাইমুনা নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল। দু’জনেই আমরা সেই হতভাগ্যদের চরম দুর্দশার কথা ভেবে অসম্ভব যন্ত্রণায় স্তম্ভিত হয়ে রইলাম। এই সমস্যাটি ভুলে যাওয়া চলবে না। সেই বিয়াল্লিশ জন শক্তসমর্থ, কঠোর পরিশ্রমী মানুষের সাহায্যে আসবার জন্য আমার মন ব্যাকুল হয়ে উঠল।
একটি কুকুর যেমন পুরো স্বাদ না পাওয়া পর্যন্ত হাড় চিবিয়েই চলে আমিও তেমন এই সমস্যার রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিশ্লেষণ করে চললাম। ৮৫৬ টাকা ঋণ যদি এমন ঋণ হয় যা তাদের নিজের তৈরি মাল যাকে খুশি বেচবার সুযোগ করে দেবে, তবেই তারা তাদের সম্ভাব্য উচ্চতম মূল্য পাবে। ব্যবসায়ী ও মহাজনদের কাছে আর তাদের বিকিয়ে থাকতে হবে না।ঠিক করলাম তাদের আমি ৮৫৬ টাকা ধার দেব। তারা আমাকে সুবিধা অনুযায়ী তা ফেরত দেবে। সুফিয়ার ঋণ দরকার। প্রতিকূল অবস্থার সঙ্গে লড়াই করার জন্য তাঁর কোনও অবলম্বন নেই।
পারিবারিক কর্তব্য সাধনের জন্য, জীবিকার জন্য (মোড়া বানানো) ও চরম বিপর্যয়ের মুখে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য তা তাঁর একান্ত দরকার। দুর্ভাগ্যবশত গরিবদের ঋণদানের জন্য তখনও পর্যন্ত কোনও প্রথাগত প্রতিষ্ঠান ছিল না। চালু প্রতিষ্ঠানগুলির ভ্রান্ত নীতির জন্য ঋণের বাজার পুরোপুরি মহাজনদের কবলিত হয়ে গেছে। এই তথাকথিত নিয়মনিষ্ঠ প্রাতিষ্ঠানিক আয়োজন দারিদ্রের একমুখী বিশাল স্রোত তৈরিতে সাহায্য করেছে। মানুষ অপদার্থ বা অলস বলে দরিদ্র নয়। তারা সারাদিন হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে। তারা গরিব শুধুমাত্র এইজন্য যে তাদের আর্থিক অবস্থা উন্নত করার জন্য কোনও অর্থনৈতিক পরিকাঠামোর অস্তিত্ব নেই। এটা একটা সাংগঠনিক সমস্যা। কোনও ব্যক্তিগত সমস্যা নয়।
মাইমুনার হাতে ৮৫৬ টাকা দিয়ে আমি বললাম, “আমাদের তালিকার ৪২ জনকে এই টাকা ধার দিয়ে এসো, যাতে তারা মহাজনের ঋণ শোধ করতে পারে ও নিজেদের তৈরি জিনিস ভাল দামে বেচতে পারে।” মাইমুনা জিজ্ঞেস করল, “কখন তারা আপনাকে টাকা ফেরত দেবে?” “যখন পারবে, কোনও তাড়া নেই।” আমি উত্তর দিলাম, “যখন তাদের তৈরি মাল বিক্রি করা সুবিধাজনক হবে, আমি তো আর মুনাফালোভী সুদের কারবারি নই।” ঘটনা এভাবে মোড় নেওয়ায় মাইমুনা হতবুদ্ধি হয়ে চলে গিয়েছিল।
সাধারণত বালিশে মাথা ঠেকানো মাত্রই আমার চোখের পাতা বুজে আসে। সে রাতে আমার কিছুতেই ঘুম এল না এই লজ্জায় যে আমি সেই সমাজেরই একজন, যে সমাজ ৪২ জন সবল, পরিশ্রমী ও দক্ষ মানুষকে তাদের জীবিকা নির্বাহের জন্য মাত্র ৮৫৬ টাকার মতো সামান্য অর্থের সংস্থান করতে পারে না।
আমি মাত্র ৮৫৬ টাকা ধার দিয়েছি। এটা ব্যক্তিগত দরদ ও ভাবাবেগ প্রসূত সমাধান মাত্র। আমি যা করেছি তা একেবারেই নগণ্য-এই চিন্তা তার পর কয়েক সপ্তাহ আমাকে ক্রমাগত তাড়িত করছিল। গোটা সমস্যার একটা প্রাতিষ্ঠানিক সমাধান অত্যন্ত জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন বিভাগীয় প্রধানের পিছু ধাওয়া করার চেয়ে একজন হতদরিদ্র অভাবী মানুষের অনেক বেশি প্রয়োজন সহজতম উপায়ে মূলধনের সন্ধান পাওয়া। যতক্ষণ তা না হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত আমার চিন্তাভাবনা সাময়িক ও ভাবাবেগের পর্যায়ে থাকবে। একটা প্রতিষ্ঠান লাগবে যার উপর তাঁরা নির্ভর করতে পারেন।
একজন গরিব মানুষের পক্ষে পাহাড়ি পথ বেয়ে উঠে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগীয় প্রধানের নাগাল পাওয়া দুঃসাধ্য। ক্যাম্পাসের গেটের রক্ষী পুলিশই তাদের ঢুকতে বাধা দেবে। পুলিশ মনে করবে ব্যাটা চুরির মতলবেই এসেছে।
কিছু একটা করতেই হবে। কিন্তু সেটা কী?ঠিক করলাম স্থানীয় ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করব। ম্যানেজারকে অনুরোধ করব গরিব মানুষদের ধারের ব্যবস্থা করার জন্য। মনে হল তা স্বচ্ছন্দে করা যাবে।
এ থেকেই সব কিছুর সূত্রপাত। একজন মহাজন হয়ে উঠবার কোনও বাসনাই আমার ছিল না। কাউকে ধার দিয়ে মহৎ হবার ইচ্ছাও ছিল না। আমি চাইছিলাম সমস্যার আশু সমাধান। আজ অবধি আমার ও গ্রামীণ ব্যাংকের সব সহকর্মীর সেই একই স্থির লক্ষ্য-দারিদ্র সমস্যার দ্রুত নিষ্পত্তি। এই সমস্যা মানবাত্মাকে গ্লানি ও অপমান ছাড়া কিছুই দেয় না। এই লেখাটি আমি লিখেছি ড. মুহাম্মদ ইউনুসকে খুশি করার জন্য নয়, আজকের বাস্তবতার নিরিখে গ্র্যামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠার সূচনা লগ্নের সত্যিকারে কত টাকা বিনিয়োগ ছিলো, মূলত টাকা বিনিয়োগের ছেয়ে মেধা বিনিয়োগ বেশি, সেই মেধাকে টাকার সাথে তুলনা করা যায় না- তা ড. মুহাম্মদ ইউনুস তা প্রমান করেছেন এই গ্যামীণ প্রতিষঠার মাধ্যমে-



