মো. কামাল উদ্দিনঃ
বিগত পায়ত্রিশ বছর ধরে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের বিভিন্ন অপকর্ম, কারাগার সংস্কার, উন্নয়ন, এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন বন্ধ করার লক্ষ্যে আমি নিরলসভাবে লিখে আসছি। আজ যেসব পরিবর্তন ও উন্নয়ন আমরা এই কারাগারে দেখতে পাচ্ছি, তা অনেকাংশে আমার লেখালেখি ও আন্দোলনের ফলশ্রুতি। এই দীর্ঘ সংগ্রামের পথ ধরে অনেক সময় পেরিয়ে গেছে, কিন্তু চট্টগ্রাম কারাগারের বর্তমান সংকটপূর্ণ পরিস্থিতি আমাকে পুনরায় কলম ধরতে বাধ্য করেছে।
বাংলাদেশের কারা ব্যবস্থায় বেসরকারি কারা পরিদর্শকদের ভূমিকা অপরিসীম। সমাজের গন্যমান্য ও মানবাধিকার সচেতন ব্যক্তিদেরকে কারা পরিদর্শক হিসেবে নিয়োগের প্রয়োজনীয়তা আজ খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ২০২১ সালে চট্টগ্রাম কারাগারে নিয়োগপ্রাপ্ত পরিদর্শকদের ব্যর্থতা, দুর্নীতি, এবং অরাজকতার শিকার হয়েছিল। এই ব্যর্থতা থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে এবং জরুরি ভিত্তিতে সমাজের যোগ্য, সৎ ও দক্ষ ব্যক্তি দেরকে এই দায়িত্বে নিয়োগ দিতে হবে বেসরকারি কারা পরিদর্শকরা কারাগারের অভ্যন্তরে স্বচ্ছতা, মানবাধিকার, এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন। তাদের প্রধান দায়িত্বের মধ্যে বন্দীদের মৌলিক অধিকার রক্ষা, কারাগারের অবকাঠামো ও সেবার মান পর্যবেক্ষণ, এবং বন্দীদের সামাজিক পুনর্বাসনের উদ্যোগ গ্রহণ অন্তর্ভুক্ত। এই দায়িত্বগুলো যথাযথভাবে পালন করা হলে, কারাগারের অভ্যন্তরে একটি মানবিক ও ন্যায়সঙ্গত পরিবেশ সৃষ্টি করা সম্ভব হবে।আমার ত্রিশ বছরের সংগ্রামের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, বর্তমান পরিস্থিতিতে চট্টগ্রাম কারাগারে বেসরকারি কারা পরিদর্শক নিয়োগের সিদ্ধান্ত কারা ব্যবস্থার জন্য একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হবে। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি আমার অনুরোধ, তারা যেন এই বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করেন এবং কারাগারে সঠিক মানুষদের নিয়োগ দিয়ে বন্দীদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করেন।বাংলাদেশের কারা ব্যবস্থাপনায় বেসরকারি পরিদর্শকদের ভূমিকা একান্ত গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষত বন্দীদের অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে। চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে বিগত বছরগুলোতে আমরা যা প্রত্যক্ষ করেছি, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ২০২১ সালে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগপ্রাপ্ত ১২ জন বেসরকারি কারা পরিদর্শক কারাগারের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে ব্যর্থ হয়েছেন। বরং, তাদের দায়িত্ব পালনকালে কারাগারে অরাজকতা, দুর্নীতি ও ঘুষের লেনদেনের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এ অবস্থায় সমাজের সচেতন অংশ থেকে দক্ষ ও সৎ ব্যক্তিদেরকে কারা পরিদর্শক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশের কারা কোডের ৫৬(১) এবং ৫৬(২) ধারায় উল্লেখ আছে যে, সমাজের গন্যমান্য ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদেরকে বেসরকারি কারা পরিদর্শক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া যাবে। এই আইনের যথাযথ প্রয়োগ হলে বন্দীদের মানবিক অধিকার রক্ষায় কারাগারের অভ্যন্তরে কার্যকর তত্ত্বাবধান ও নজরদারি সম্ভব হবে। তবে, দুঃখজনকভাবে, প্রাসঙ্গিক এই ধারাগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন এখনো অনুপস্থিত। চট্টগ্রাম কারাগারের বর্তমান পরিস্থিতি আরো ঘনীভূত হয়েছে এই ব্যর্থতা থেকেই।
কারাগারে অরাজকতা ও দুর্নীতির মতো গুরুতর সমস্যাগুলো সমাধানে এবং বন্দীদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে হলে, এখনই বেসরকারি কারা পরিদর্শক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনা অত্যন্ত জরুরি। সমাজের বিভিন্ন পেশায় জড়িত, বিশেষ করে বন্দী অধিকার বিষয়ে সচেতন এবং সৎ ব্যক্তিদেরকে এই পদে নিয়োগ দেওয়া দরকার। তারা কেবলমাত্র তত্ত্বাবধানেই সীমাবদ্ধ থাকবেন না, বরং বন্দীদের জন্য ন্যায্য পরিবেশ সৃষ্টিতে সহযোগিতা করবেন।
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি, জরুরি ভিত্তিতে চট্টগ্রাম কারাগারে বেসরকারি কারা পরিদর্শক নিয়োগের ব্যবস্থা গ্রহণ করুন। সমাজের যোগ্য, সৎ ও দক্ষ ব্যক্তিদেরকে এই দায়িত্ব দিয়ে, বন্দীদের অধিকার রক্ষা ও কারাগারে অরাজকতার অবসান ঘটানো সম্ভব হবে। বাংলাদেশের কারা ব্যবস্থার জন্য এটি হবে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ – কারা পরিদর্শকদের আসলেই কাজ কি তাদের দায়িত্ব নিয়ে কিছু কথা বলার প্রয়োজন–
বেসরকারি কারা পরিদর্শকদের ভূমিকা ও দায়িত্ব: কারা ব্যবস্থায় ন্যায় বিচারের আলোকে বেসরকারি কারা পরিদর্শকরা কারাগারের অভ্যন্তরে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন। তারা মূলত এমন ব্যক্তিরা, যারা সরকার কর্তৃক নিযুক্ত হয়ে বন্দীদের অধিকার রক্ষা ও কারাগারের কার্যক্রমে নজরদারি করার দায়িত্ব পালন করেন। এটি একটি সম্মানজনক দায়িত্ব, যা কার্যকরভাবে পালন করা হলে কারাগারের অভ্যন্তরে স্বচ্ছতা ও মানবাধিকার নিশ্চিত করা যায়। এখানে বেসরকারি কারা পরিদর্শকদের ভূমিকা ও দায়িত্বগুলো বিশদভাবে আলোচনা করা করছি।
বন্দীদের অধিকার রক্ষা-বেসরকারি কারা পরিদর্শকদের প্রধান দায়িত্ব হলো বন্দীদের মৌলিক অধিকার রক্ষা করা। তারা নিশ্চিত করেন যে বন্দীরা তাদের আইনসম্মত অধিকারগুলো ভোগ করছে—যেমন মানবিক আচরণ, যথাযথ চিকিৎসা, মানসম্মত খাদ্য এবং যথাসময়ে বিচার প্রাপ্তির অধিকার। পরিদর্শকরা কারাগারের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হলে তা অবিলম্বে কর্তৃপক্ষের নজরে আনেন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে সহযোগিতা করেন।কারাগারের অবকাঠামো ও সেবার মান পর্যবেক্ষণ-
কারাগারের অবকাঠামো এবং বন্দীদের সেবার মান পর্যবেক্ষণ করা বেসরকারি কারা পরিদর্শকদের অন্যতম দায়িত্ব। কারাগারের ভিতরে থাকা বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা, যেমন—বাসস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, খাদ্য সরবরাহ ইত্যাদির মান পর্যালোচনা করে তা বন্দীদের জন্য যথাযথ কিনা, তা নিশ্চিত করা তাদের কাজের অংশ। যদি কোনরকম অব্যবস্থাপনা বা অবনতি পাওয়া যায়, তবে তা কর্তৃপক্ষকে অবহিত করে সংশোধনের সুপারিশ করেন তারা।
কারাগারের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা-বেসরকারি কারা পরিদর্শকরা কারাগারের প্রশাসনিক কার্যক্রমের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করেন। কারাগারে যে কোনো ধরণের দুর্নীতি, ঘুষ বা অন্যায় আচরণ রোধে তারা যথাযথ তদন্ত করে এবং সেই অনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণে সাহায্য করেন। তারা বন্দীদের ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে যেকোনো অনিয়মের বিরুদ্ধে সরব থাকেন।
বন্দীদের সামাজিক পুনর্বাসন ও শিক্ষার প্রচারণা-বেসরকারি কারা পরিদর্শকরা বন্দীদের সামাজিক পুনর্বাসনের জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি আয়োজন করতে পারেন। যেমন—শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, কাউন্সেলিং ইত্যাদির ব্যবস্থা করা, যাতে বন্দীরা সমাজে ফিরে আসার পর পুনরায় অপরাধের পথে না চলে যায়। এ ধরণের কর্মসূচি কারাগারের অভ্যন্তরে একটি ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করতে সহায়তা করে।
পরিদর্শন রিপোর্ট তৈরি করা-
বেসরকারি কারা পরিদর্শকদের দায়িত্বের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো কারাগারে তাদের পর্যবেক্ষণ ও কর্মকাণ্ডের ওপর ভিত্তি করে নিয়মিত রিপোর্ট তৈরি করা। এই রিপোর্টগুলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিয়ে, তারা কারাগারের বর্তমান অবস্থা ও প্রয়োজনে সংশোধনের প্রস্তাবনা প্রদান করেন। এ ধরনের রিপোর্ট কারা ব্যবস্থার উন্নতিতে কার্যকর ভূমিকা রাখে।বন্দীদের অভিযোগ ও সমস্যার সমাধান-
বন্দীরা কারাগারে যে কোনো সমস্যা বা অভিযোগ নিয়ে বেসরকারি পরিদর্শকদের সাথে সরাসরি কথা বলতে পারেন। পরিদর্শকরা এসব অভিযোগ শুনে সেগুলো সমাধানের জন্য যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন এবং বন্দীদের সাথে কারা প্রশাসনের মধ্যস্থতা করেন।
উপসংহার:
বেসরকারি কারা পরিদর্শকদের ভূমিকা এবং দায়িত্ব কারাগারে মানবাধিকার, স্বচ্ছতা এবং বন্দীদের ন্যায্যতা নিশ্চিত করার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে যদি যোগ্য, সৎ এবং দক্ষ পরিদর্শকদের নিয়োগ দেওয়া হয়, তবে এটি কারা ব্যবস্থার উন্নতির জন্য একটি মাইলফলক হয়ে দাঁড়াবে। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি অনুরোধ, তারা যেন জরুরি ভিত্তিতে এ বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।আমি এই লেখাটি৷ আজকে প্রাথমিক ভাবে লিখলাম আগামীতে আরো বিস্তারিত লিখবো ইনশাআল্লাহ।
লেখকঃ সাংবাদিক গবেষক টেলিভিশন উপস্থাপক।



