মো. কামাল উদ্দিনঃ
কখনও কখনও সামাজিক কারণে মানুষ দেনা করতে বাধ্য হন (যেমন মেয়ের বিয়ে, কোনও সরকারি কর্মচারীকে ঘুষ দেওয়া, মামলা লড়া, কোনও সামাজিক অনুষ্ঠানের খরচ বহন করা)। কিন্তু অস্তিত্ব রক্ষার জন্যও (যেমন খাদ্য ও ওষুধ জোগাড় বা জরুরি কোনও অবস্থা সামাল দেবার জন্য) মানুষকে ধার করতে হয়। এই সব পদ্ধতিতে গ্রহীতার পক্ষে ঋণের বোঝা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হওয়া অত্যন্ত দুঃসাধ্য। হয় তাকে আবার কর্জ করতে হয় কেবল মাত্র ঋণশোধের জন্য। পরিণামে তাদের সামনে একটি পথই খোলা থাকে। তা হল মৃত্যু। প্রত্যেক সমাজে মহাজনী কারবার রয়েছে। দরিদ্র জনগণকে এদের কবল থেকে উদ্ধার না করতে পারলে কোনও অর্থনৈতিক প্রকল্পই দারিদ্রের নিরবচ্ছিন্ন গতিকে রোধ করতে
পারবে না। সুফিয়া বেগম আবার তাঁর কাজ শুরু করলেন। আমাদের সঙ্গে কথা বলে সময় নষ্ট করার উপায় তাঁর ছিল না। তাঁর রোদে পোড়া শীর্ণ বাদামি হাত দুটি বাঁশের চাঁচরি বুনছিল। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস একইভাবে কাজ করে
যান তিনি। আমি তাই দেখতে লাগলাম। এটাই তাঁর জীবনধারণের উপায়। খালি পায়ে, রুক্ষ কঠিন মাটির উপর তিনি উবু হয়ে বসেছিলেন। হাতের আঙুলে কড়া, নখগুলি কাদা মেখে কালো হয়ে গেছে।
তাঁর সন্তানেরা কি পারবে দারিদ্রের এই চক্রব্যূহ থেকে বেরিয়ে উন্নত কোনও জীবনের সন্ধান পেতে। এই নিদারুণ দুঃখ, যন্ত্রণা থেকে তাঁর শিশুরা মুক্তি পাবে এই চিন্তা একেবারে অর্থহীন। পেটের ভাত, মাথার উপর ছাদ ও পরনের কাপড় জোটাতেই যখন উপার্জনে
কুলোয় না তখন কী উপায়ে তারা স্কুলে যাবে?
“তা হলে সারাদিনের খাটুনির বিনিময়ে এই হল আয়? পঞ্চাশ পয়সা মাত্র? আট আনা?” “হ্যাঁ, তাও যেদিন কপাল ভাল থাকে।”
সুফিয়া দিনে মাত্র পঞ্চাশ পয়সা রোজগার করে এই ভাবনা আমার অনুভূতিকে অসাড় করে দিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণীকক্ষে আমরা অনায়াসে কোটি কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে কথাবার্তা বলি আর এখানে আমার চোখের সামনে জীবন-মৃত্যুর মতো সমস্যার হিসেবনিকেশ তৈরি হচ্ছে মাত্র ক’টা পয়সার দ্বারা? কোথাও ভীষণ ভুল হচ্ছে। কেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণীকক্ষে এই মহিলার বাস্তব জীবন প্রতিফলিত হয় না? নিজের উপর ভীষণ ধিক্কার জাগল আমার। রাগ হল গোটা পৃথিবীর উপর, যে এ ব্যাপারে একেবারে উদাসীন। কোথাও আশার আলো নেই, সমাধানের কোনও সূত্র পর্যন্ত নেই।
সুফিয়া বেগম নিরক্ষর হলেও তার কর্মদক্ষতার অভাব নেই। তিনি যে জীবিত আছেন- আমাদেরই সামনে বসে দ্রুত হাত চালিয়ে কাজ করছেন, শ্বাস-প্রশ্বাস নিচ্ছেন, সব রকম প্রতিকূলতা সত্ত্বেও নীরবে সংগ্রাম করে যাচ্ছেন সেটাই প্রমাণ করে তিনি অন্তত একটি
ক্ষমতার অধিকারী, অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার অসাধারণ দক্ষতা। দারিদ্রের ইতিহাসও পৃথিবীর ইতিহাসের মতোই প্রাচীন। সুফিয়ার অর্থনৈতিক উন্নতির
কোনও সুযোগই নেই। কিন্তু কেন? উত্তর আমার জানা ছিল না। চারপাশে অগণিত গরিব মানুষের মধ্যেই আমরা বড় হই। অথচ কখনও প্রশ্ন করি না কেন তারা গরিব। আমার মনে হল চিরাচরিত অর্থনৈতিক পরিকাঠামো এমনভাবে তৈরি যে তা সুফিয়ার উপার্জন নিয়ন্ত্রিত করে। তাঁর রোজগার নিয়মিতভাবে এমনই কম থাকে যাতে তার এক পয়সাও সঞ্চয় করা সম্ভব হয় না। তাঁর আর্থিক উন্নতির জন্য তিনি কোনওক্রমে অর্থ বিনিয়োগ করতে পারেন না। তাই তাঁর সন্তানেরা দারিদ্রের অভিশাপের মধ্যে কাল কাটায়। বাঁচার জন্য শুধু দুমুঠো অন্নসংস্থানের চেষ্টা করে যায়। যেমন তাঁর পূর্বপুরুষেরা যুগে যুগে করে এসেছে।
মাত্র পাঁচ টাকার অভাবে কেউ এত কষ্ট সহ্য করছে তা কখনও শুনিনি। এটা আমার কাছে অসম্ভব ও অসহনীয় মনে হল। আমি কি সুফিয়াকে মূলধনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ নিজের পকেট থেকে দেব? সেটা খুবই সহজ, একেবারেই জটিলতামুক্ত।
আমার বিশ্ববিদ্যালয়, আমার অর্থনীতি বিভাগ, বিশ্বজুড়ে সমস্ত অর্থনীতি বিভাগ এবং
হাজার হাজার বুদ্ধিদীপ্ত অর্থনীতির অধ্যাপকেরা কেন এই গরিবদের বুঝতে চেষ্টা করেননি? সত্যিই যাদের সাহায্যের দরকার তাদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেননি কেন? সুফিয়াকে অর্থ সাহায্য দেবার অদম্য ইচ্ছা আমি সংবরণ করলাম। তিনি আমার দয়ার প্রত্যাশী নন। সেটা কোনও চিরস্থায়ী সমাধানও নয়।চারদিকে মানুষ কাজ করছে। কেউ ক্ষেতে লাঙল চযছে, কেউ রিকশা সারাচ্ছে, কেউ লোহা পেটাই করছে। বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে মানুষের দৈহিক শ্রমের বিরাম নেই। তাদের শারীরিক শক্তি ও কর্মতৎপরতা আমাকে মুগ্ধ করে।
গাড়ি নিয়ে লতিফী ও আমি পাহাড়ের উপর আমার বাড়িতে ফিরে এলাম। শেষ বেলার নরম আলোয় আমরা বাগানে পায়চারি করতে লাগলাম। পাহাড়ে ওঠানামা আমার স্বাস্থ্যের জন্য ভাল। আমার পায়ের তলায় উপযুক্ত পরিমাণ খাঁজ না-থাকার কারণে কোনওদিনই আমি খেলোয়াড় হতে পারিনি। খুব ছোট বেলায় নেহাতই খেলার ছলে সাঁতার শিখেছিলাম। ডাক্তাররা বলতেন আমি যথেষ্ট ব্যায়াম করি না। সেইজন্য সর্বত্র আমি পায়ে হেঁটে চলতাম। বন্ধুরা কেবলই শরীরের প্রতি নজর দিতে উপদেশ দিত কিন্তু স্বাস্থ্যরক্ষায় ব্যয় করার মতো সময় বা উৎসাহ কোনওটাই আমার ছিল না। আমি চিন্তা করছিলাম সরকারের আশ্বাস ও সত্যিকারের বাস্তবতার ফারাকের কথা।বিশ্ব মানবাধিকার সনদ বলছে,
“প্রতি মানুষেরই তার ও নিজের পরিবারের সকলকে নিয়ে এক ন্যূনতম নির্দিষ্ট মানে সুস্থ সবল থাকার অধিকার আছে। এর অন্তর্গত হল খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সামাজিক পরিষেবার সুযোগ। বেকারত্ব, অসুখ, প্রতিবন্ধকতা, বৈধব্য, বার্ধক্য, জীবিকার অনিশ্চয়তা ও অপ্রতুলতা-ইত্যাদি যেসব অবস্থার উপর তার কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই-সেই সব ক্ষেত্রে নিরাপত্তা পাবার অধিকার তার আছে।



