রাজধানীর পল্লবীতে আট বছর বয়সী শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে সোহেলকে ৫ লাখ টাকা এবং স্বপ্নাকে ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ড করা হয়েছে। আসামিদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বিক্রি করে এই অর্থদণ্ডের টাকা আদায়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আজ রোববার (৭ জুন) দুপুর পৌনে ১২টার দিকে ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন জনাকীর্ণ আদালতে এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় দুই আসামিই আদালতের কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন। পরে সাজা পরোয়ানা মূলে তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। এই রায়কে কেন্দ্র করে সকাল থেকেই আদালত এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন করে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়।
আইন ও বিচার সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দেশের ইতিহাসে এর আগে এত কম সময়ে কোনো ধর্ষণ ও হত্যা মামলার বিচার কাজ শেষ হওয়ার নজির নেই। আলোচিত এই মামলাটির বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু থেকে রায় পর্যন্ত আসতে সময় লেগেছে মাত্র ৫ কার্যদিবস (টানা ১৯ দিনের মাথায় রায়)।
এর আগে গত বছর মাগুরায় আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলার বিচার কাজ ১৪ কার্যদিবসে শেষ হয়েছিল। তবে মাদক মামলা ৩ কার্যদিবসে নিষ্পত্তির পূর্ব রেকর্ড রয়েছে।
গত ১৯ মে দুপুরে পল্লবীর ১১ নম্বর সেকশনের বি ব্লকের একটি ফ্ল্যাট থেকে শিশু রামিসার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এই নৃশংস ঘটনাটি সারাদেশে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভুক্তভোগী পরিবারের বাসায় গিয়ে সমবেদনা জানান এবং দ্রুততম সময়ে বিচার সম্পন্ন করার আশ্বাস দেন।
ঘটনার পরদিনই রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় মামলা করেন। ঘটনার মাত্র ৫ দিনের মাথায় ২৪ মে দুপুরে তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার এসআই অহিদুজ্জামান আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) জমা দেন। ঢাকার মহানগর হাকিম আশরাফুল হক দ্রুততার সঙ্গে নথি পর্যালোচনার পর মামলাটি বিচারের জন্য ট্রাইব্যুনালে বদলি করেন। মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে ট্রাইব্যুনালের অবকাশকালীন ছুটিও বাতিল করা হয়েছিল।
১ জুন প্রথম দিন আসামিদের অব্যাহতির আবেদন নাকচ করে সোহেল ও স্বপ্নার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন আদালত। ২ জুন দ্বিতীয় দিন মামলার ১৭ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৬ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়। ৩ জুন তৃতীয় দিন আসামিদের আত্মপক্ষ শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানিতে স্বপ্না নিজেকে নির্দোষ দাবি করলেও সোহেল রানা আদালতের কাছে ক্ষমা চেয়ে খালাস প্রার্থনা করেন। ৪ জুন চতুর্থ দিন উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হয় যেখানে রাষ্ট্রপক্ষ সর্বোচ্চ সাজা দাবি করে এবং আসামিপক্ষ লঘুদণ্ড প্রার্থনা করে। অবশেষে ৭ জুন পঞ্চম দিন আজ আদালত মামলার রায় ঘোষণা করেন।
যুক্তিতর্ক চলাকালীন রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি আজিজুর রহমান দুলু আদালতে সোহেল রানার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি পড়ে শোনান। যেখানে স্পষ্ট হয় যে, ঘটনার দিন সোহেলকে পালিয়ে যেতে তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারই ঘরের দরজা খুলে দিয়ে সহযোগিতা করেছিলেন।
ঐতিহাসিক এই রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা। তিনি দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি আজিজুর রহমান দুলুও এই রায়কে মাইলফলক উল্লেখ করে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন।
আরু/



