চট্টগ্রামের দেওয়ানহাটের ঐতিহ্যবাহী শ্রীশ্রী দেওয়ানেশ্বরী সার্বজনীন কালী মন্দির যা দেওয়ানেশ্বরী কালীবাড়ি নামে পরিচিত দীর্ঘদিন ধরে সনাতন সম্প্রদায়ের ধর্মীয় বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। কালীপূজা, শ্যামাপূজা, দীপাবলিসহ বিভিন্ন ধর্মীয় আয়োজনে প্রতিবছর এখানে সমাগম ঘটে অসংখ্য ভক্তের। তবে ঐতিহ্যবাহী এই মন্দিরের পরিচালনা কমিটি গঠন, দান-অনুদান, রসিদ বই, অর্থ ব্যবস্থাপনা এবং ভক্তদের দেওয়া মূল্যবান স্বর্ণালংকারের হিসাব নিয়ে বর্তমানে উঠেছে নানা প্রশ্ন।
স্থানীয় সনাতনী ভক্তদের একাংশের অভিযোগ, মন্দিরের ২০১৯ সালে সংশোধিত গঠনতন্ত্র যথাযথভাবে অনুসরণ না করেই বর্তমান পরিচালনা কমিটি গঠন করা হয়েছে। একই সঙ্গে ভক্তদের দান করা প্রায় ২০ ভরি স্বর্ণালংকারের হিসাব ও বর্তমান অবস্থান নিয়েও স্বচ্ছতা নেই বলে অভিযোগ তাদের।
২০ ভরি স্বর্ণের হিসাব কোথায়?
অভিযোগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয় মন্দিরের স্বর্ণালংকার।
স্থানীয় ভক্তদের দাবি, দীর্ঘদিনে মন্দিরে প্রায় ২০ ভরি স্বর্ণালংকার দান করা হয়েছে। কিন্তু এসব স্বর্ণের পূর্ণাঙ্গ তালিকা, ওজন, দাতার তথ্য, সংরক্ষণস্থল এবং বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে সাধারণ ভক্তদের সামনে স্পষ্ট কোনো হিসাব উপস্থাপন করা হয়নি।
বিষয়টি নিয়ে মন্দির পরিচালনা কমিটির সভাপতি ধীরেন্দ্র দাস গুপ্তের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ছাড়া মন্দিরের স্বর্ণালংকার দেখানো সম্ভব নয়।
জবাবদিহির বিষয়ে তার বক্তব্যের সারমর্ম-মন্দিরের সম্পদ পরিচালনা কমিটিই দেখভাল করে।
এদিকে মন্দির পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক অমল কর্মকারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে কিছু জানেন না বলে জানান এবং সভাপতির সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।
সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বক্তব্যে এমন অস্পষ্টতা স্থানীয় ভক্তদের মধ্যে আরও উদ্বেগ তৈরি করেছে বলে দাবি তাদের।
‘এগুলো আমাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার’-অভিযোগ
মন্দির পরিচালনা কমিটির সহ-সাধারণ সম্পাদক বিষ্ণুদে অভির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি গণমাধ্যমকর্মীদের এসব বিষয় নিয়ে মাথা না ঘামানোর কথা বলেন। একই সঙ্গে বিষয়গুলোকে তাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার বলেও উল্লেখ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে স্থানীয় ভক্তদের প্রশ্ন- সার্বজনীন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে ভক্তদের দান করা সম্পদ, অনুদান ও অর্থ ব্যবস্থাপনার বিষয়টি কতটা ব্যক্তিগত? এর উত্তর নির্ধারণে মন্দিরের গঠনতন্ত্র, সংশ্লিষ্ট নথিপত্র এবং প্রচলিত আইন পর্যালোচনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।
গঠনতন্ত্রে ৩৫, কমিটি ৪১-প্রশ্ন বৈধতা নিয়ে
মন্দির পরিচালনা কমিটির কাঠামো নিয়েও উঠেছে অভিযোগ।
স্থানীয় ভক্তদের দাবি, ২০১৯ সালে সংশোধিত গঠনতন্ত্রে কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য সংখ্যা ৩৫ জন নির্ধারণ করা হলেও বর্তমানে ৪১ সদস্যের কমিটি করা হয়েছে।
তাদের অভিযোগ, গঠনতন্ত্রের ৬(গ), ১১(ক), ১২(চ), ১৭(জ), ২৫(খ), ২৬(ঙ), ২৭(গ), ২৮(ছ)-এর দ্বিতীয় অংশ, ২৯(গ), ৩১(খ) এবং ৩৩(ক) ও (খ) ধারার বিষয়গুলো যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করতে গঠনতন্ত্রের মূল কপি, সাধারণ সভার কার্যবিবরণী, অনুমোদনপত্র এবং কমিটি গঠনের সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই করা প্রয়োজন।
স্থানীয় ভক্তদের প্রশ্ন- গঠনতন্ত্রে পরিবর্তন আনা হয়ে থাকলে তা কখন, কীভাবে এবং কার অনুমোদনে করা হয়েছে? ৪১ সদস্যের কমিটির বৈধতার ভিত্তিই বা কী?
ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দে ভক্তদের বাদ দেওয়ার অভিযোগ
দীর্ঘদিনের ত্যাগী ও সম্মানিত ভক্তদের যথাযথ মূল্যায়ন না করে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের ভিত্তিতে কমিটি গঠনের চেষ্টা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন স্থানীয়দের একাংশ।
তাদের দাবি, এতে মন্দির পরিচালনায় দীর্ঘদিনের পারস্পরিক আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ভক্তসমাজের মধ্যে বিভাজন তৈরি হয়েছে।
তবে কারা বাদ পড়েছেন, কী প্রক্রিয়ায় কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং গঠনতন্ত্রে এ বিষয়ে কী বলা আছে এসব নথি যাচাই করলেই অভিযোগের প্রকৃত সত্যতা নির্ধারণ করা সম্ভব।
রসিদ বই ও অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন
মন্দিরের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও রয়েছে নানা অভিযোগ।
স্থানীয় কয়েকটি সূত্রের দাবি, উন্নয়ন ও অন্যান্য কার্যক্রমের নামে অর্থ সংগ্রহ করা হলেও সব অর্থের যথাযথ হিসাব প্রকাশ করা হয়নি। রসিদ বইয়ের ব্যবহার, সংরক্ষণ এবং সংগৃহীত অর্থের সঙ্গে হিসাব মেলানো নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা।
কেউ কেউ বড় অঙ্কের আর্থিক অনিয়মের আশঙ্কার কথাও বলছেন। তবে এ মুহূর্তে এমন অভিযোগকে প্রমাণিত সত্য হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। এর জন্য প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত ও পূর্ণাঙ্গ হিসাব নিরীক্ষা।
নিরপেক্ষ তদন্ত ও অডিটের দাবি
স্থানীয় ভক্তদের দাবি, মন্দিরের সম্পদ, স্বর্ণালংকার, দান-অনুদান ও আয়-ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ হিসাব নিরপেক্ষভাবে নিরীক্ষা করা হোক। একই সঙ্গে কমিটি গঠনের বৈধতা যাচাই করে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ভক্তদের সামনে প্রকাশ করা হোক।
তাদের আরও দাবি, প্রয়োজন হলে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের হস্তক্ষেপে নিরপেক্ষ তদন্ত করা হোক। এতে প্রকৃত ঘটনা সামনে আসবে এবং মন্দির পরিচালনা নিয়ে তৈরি হওয়া বিভ্রান্তিরও অবসান হবে বলে মনে করছেন তারা।
তবে প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর কোনোটিকেই তদন্ত ছাড়া চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে না।
সংশ্লিষ্ট নথিপত্র, গঠনতন্ত্র, হিসাব-নিকাশ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাইয়ের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করাই এই প্রতিবেদনের উদ্দেশ্য।
দেওয়ানেশ্বরী কালীবাড়ি পরিচালনা নিয়ে আরও যেসব অভিযোগ ও তথ্য সামনে এসেছে, থাকছে ধারাবাহিক প্রতিবেদনের দ্বিতীয় পর্বে।
চোখ রাখুন দেওয়ানেশ্বরী কালীবাড়ি পরিচালনার নেপথ্যে কারা? বিভিন্ন মামলা ও অপকর্মে জড়িত ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ কতটা সত্য? নথি ও তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে বিস্তারিত আসছে দ্বিতীয় পর্বে।
আরু|



