ইলন মাস্কের মহাকাশ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স–এর একটি নিয়ন্ত্রণহীন ফ্যালকন-৯ রকেটের উপরের অংশ বুধবার (৫ আগস্ট) চাঁদের পৃষ্ঠে আছড়ে পড়েছে। প্রায় ৪ টন ওজনের এবং পাঁচতলা ভবনের সমান এই রকেটাংশটি প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ২ দশমিক ৪৩ কিলোমিটার (ঘণ্টায় প্রায় ৮ হাজার ৭০০ কিলোমিটার) গতিতে চাঁদে আঘাত হানে। ঘটনাটি নাসাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা পর্যবেক্ষণ করেছেন।
জানা গেছে, ২০২৫ সালে একটি আন্তর্জাতিক চন্দ্রাভিযানে দুটি চন্দ্রযান ও বৈজ্ঞানিক গবেষণা সরঞ্জাম মহাকাশে পাঠাতে এই ফ্যালকন-৯ রকেট ব্যবহার করা হয়েছিল। মূল মিশন শেষ হওয়ার পর রকেটের পুনর্ব্যবহারযোগ্য অংশ পৃথিবীতে ফিরে এলেও উপরের অংশটি মহাকাশেই থেকে যায়। এরপর প্রায় ১৮ মাস ধরে পৃথিবী, চাঁদ ও সূর্যের মহাকর্ষীয় প্রভাবে এটি ধীরে ধীরে কক্ষপথ পরিবর্তন করে শেষ পর্যন্ত চাঁদের দিকে এগিয়ে যায় এবং নির্ধারিত সময়েই চাঁদের বুকে আঘাত হানে।
প্রাথমিক বিশ্লেষণে জানা গেছে, সংঘর্ষটি চাঁদের আইনস্টাইন ক্রেটারের কাছাকাছি এলাকায় ঘটেছে। আঘাতের ফলে সেখানে একটি নতুন গর্ত তৈরি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এই সংঘর্ষ পৃথিবী বা মানুষের জন্য কোনো ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেনি বলে জানিয়েছে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনা গবেষণার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। সাধারণত উল্কাপিণ্ড কখন বা কী গতিতে চাঁদে আঘাত করবে, তা আগে থেকে নিশ্চিতভাবে জানা যায় না। কিন্তু এবার রকেটটির ভর, গতি ও আঘাতের সময় আগেই জানা ছিল। ফলে সংঘর্ষের ফলে সৃষ্ট ধূলিকণা, গর্তের আকার এবং চাঁদের মাটির প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা নতুন তথ্য সংগ্রহ করতে পারবেন।
সংঘর্ষটি খালি চোখে পৃথিবী থেকে দেখা সম্ভব হয়নি। তবে বিশ্বের বিভিন্ন মানমন্দিরের শক্তিশালী টেলিস্কোপ দিয়ে ধূলোর মেঘ ও আলোর ঝলক পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। এছাড়া নাসার লুনার রিকনিসেন্স অরবিটার (LRO) এবং দক্ষিণ কোরিয়ার দানুরি চন্দ্রযান আঘাতস্থলের আগে ও পরের ছবি বিশ্লেষণ করবে। এসব তথ্য প্রকাশের পর সংঘর্ষের প্রকৃত প্রভাব সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানা যাবে।
এদিকে এই ঘটনা আবারও মহাকাশ বর্জ্য (স্পেস ডেব্রিস) নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
বিজ্ঞানীদের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন দেশের চন্দ্রাভিযান ও মহাকাশ মিশনের ফলে বর্তমানে চাঁদে মানুষের তৈরি প্রায় ৩ হাজারের মতো বস্তু পড়ে রয়েছে, যেগুলোর সম্মিলিত ওজন প্রায় ১৯০ টন। ১৯৫৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের লুনা-২ প্রথম চাঁদে আঘাত করার পর থেকে ধাপে ধাপে এসব যন্ত্রাংশ সেখানে জমা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, ভবিষ্যতে চাঁদে অভিযান এবং কৃত্রিম উপগ্রহের সংখ্যা আরও বাড়বে। তাই মহাকাশ বর্জ্য নিয়ন্ত্রণে কার্যকর আন্তর্জাতিক নীতিমালা না থাকলে এসব পরিত্যক্ত রকেট ও যন্ত্রাংশ ভবিষ্যতের চন্দ্রাভিযান, গবেষণা কার্যক্রম এবং মহাকাশযানের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠতে পারে।
আরু||খব



