২৭ বছরের দীর্ঘ এক অপেক্ষার অবসান। যে বাবার নামের ছায়াতলে বেড়ে ওঠার কথা ছিল, সেই পরিচয় খুঁজে পেতে কেটে গেল জীবনের প্রায় তিন দশক। অবশেষে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় এক আবেগঘন মুহূর্তের সাক্ষী হলো লিগ্যাল এইড কার্যালয়—যেখানে আদালতের রায়ের কাগজে নয়, বরং বাবার আলিঙ্গনে আপন ঠিকানায় ফিরলেন আরিয়ান (ছদ্মনাম)।
২৭ বছর ধরে পরিচয়হীনতার যে গ্লানি আর প্রশ্নবিদ্ধ জীবন আরিয়ানকে বহন করতে হয়েছে, তা হয়তো কোনো শব্দ দিয়ে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। জন্মের সময় বাবা ছিলেন প্রবাসে, এরপরই মা-বাবার বিচ্ছেদ আর ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে বাবার স্নেহ থেকে বঞ্চিত হয়ে বেড়ে ওঠা—সব মিলিয়ে আরিয়ানের শৈশব ছিল এক অসম্পূর্ণ গল্পের মতো। বাবার নতুন সংসার আর সম্পর্কের জটিলতায় তিনি নিজেকে খুঁজে পাচ্ছিলেন এক অজানা ঠিকানায়।
কিন্তু রক্তের টান কি মিথ্যে হয়? প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর নিজের অধিকারের লড়াই শুরু করেন আরিয়ান। শুরুতে বাবার অস্বীকার তাকে ক্ষতবিক্ষত করলেও, তিনি দমে যাননি। লিগ্যাল এইডের দ্বারস্থ হয়ে শুরু হয় আইনি লড়াই। অবশেষে ডিএনএ পরীক্ষার বৈজ্ঞানিক সত্যতা আর আইনগত সহায়তার হাত ধরে বেরিয়ে আসে সেই কাঙ্ক্ষিত রায়—মুরশেদ (ছদ্মনাম) আরিয়ানেরই বাবা।
মঙ্গলবার চট্টগ্রামের জেলা লিগ্যাল এইড কার্যালয়ে যখন সমঝোতা চুক্তির সই হচ্ছিল, তখন সেখানে কোনো পক্ষ ছিল না, ছিল কেবল একজন বাবা ও তার সন্তান।
চুক্তি অনুযায়ী, বাবা তাকে সন্তান হিসেবে স্বীকৃতি দিলেন, দিলেন নিজের বাড়িতে জায়গা ও সম্পদের অধিকার। কিন্তু এসব কাগজ-কলমের হিসাবের চেয়েও বড় ছিল সেই মুহূর্তটি—যখন দীর্ঘ বিচ্ছেদের দেয়াল ভেঙে বাবা ও ছেলে একে অপরকে জড়িয়ে ধরেন।
সেই আলিঙ্গনে ছিল না কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা, ছিল কেবল দীর্ঘ ২৭ বছরের জমে থাকা চাপা কান্না আর অনুশোচনা। বাবা ফিরে পেলেন তার হারানো সন্তানকে, আর আরিয়ান পেলেন সেই পিতৃপরিচয়, যার জন্য তিনি দীর্ঘ সময় সমাজে নানা প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছেন।
আরিয়ানের চোখে আজ আনন্দাশ্রু। সমাজ ও আত্মীয়স্বজনের কাছে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর অধিকার পেয়েছেন তিনি। আর লিগ্যাল এইড কার্যালয়ের সেই কক্ষটি যেন এক অমোঘ সত্যের সাক্ষী হয়ে রইল—আইনের কঠিন মারপ্যাঁচের চেয়েও বড় হলো রক্তের টান, যা শেষ পর্যন্ত সব অভিমানে ইতি টেনে দিল।
একটি দীর্ঘ লড়াই শেষে এক নতুন ভোর। আরিয়ানের জীবনে আজ হয়তো আর কোনো প্রশ্ন নেই, আছে শুধু বাবার পরিচয় পাওয়ার নির্মল প্রশান্তি।
আরু/



