মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগ ও ব্যাংকঋণের চাহিদা বাড়াতে প্রথমবারের মতো তিন মাস মেয়াদি মুদ্রানীতি ঘোষণা করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর এই তিন মাসের জন্য নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হবে।
বুধবার বিকেল ৩টায় বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. মো. হাবিবুর রহমান নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করবেন। এর মাধ্যমে দীর্ঘদিনের ছয় মাস মেয়াদি মুদ্রানীতি কাঠামো থেকে তিন মাস অন্তর মুদ্রানীতি ঘোষণার নতুন ধারায় যাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল চ্যালেঞ্জ এখন মূল্যস্ফীতি কমানোর ধারাবাহিকতা ধরে রাখার পাশাপাশি দুর্বল বেসরকারি বিনিয়োগ ও ঋণের চাহিদায় গতি ফেরানো। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ে বেসরকারি খাতে ব্যাংকঋণের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ দশমিক ৬২ শতাংশ। এর আগের মাস জুনে এই প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ, যা ছিল রেকর্ড সর্বনিম্ন। ডিসেম্বর পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ দশমিক ৮০ শতাংশ।
অর্থনীতিবিদ ও খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, দুর্বল বিনিয়োগ, ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা, জ্বালানি সংকট এবং ঋণের উচ্চ খরচের কারণে নতুন ঋণের চাহিদা কম রয়েছে। ফলে ব্যাংকিং খাতে তারল্য থাকলেও তা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় উৎপাদনশীল খাতে যাচ্ছে না।
বেসরকারি বিনিয়োগে গতি ফেরাতে জুলাইয়ের শেষ দিকে নীতি সুদহার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২ আগস্ট থেকে নতুন হার কার্যকর হয়। ছয় বছর পর এটি ছিল নীতি সুদহারে প্রথম কমানো। তবে সেপ্টেম্বরের বৈঠকে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বিবেচনায় নীতি সুদহার ৯ দশমিক ৫০ শতাংশেই অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
অন্যদিকে মূল্যস্ফীতির হার সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা কমেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে দেশের সাধারণ মূল্যস্ফীতি কমে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। জুলাইয়ে তা ছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। আগস্টের হার গত ১০ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন হলেও তা সরকারের চলতি অর্থবছরের ৭ দশমিক ৫ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার ওপরে রয়েছে।
ফলে নতুন মুদ্রানীতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে ঋণ ও বিনিয়োগ বাড়ানোর মধ্যে ভারসাম্য রাখাই বড় বিষয় হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক অবস্থান অনুযায়ী, মূল্যস্ফীতি এখনো লক্ষ্যমাত্রার ওপরে থাকায় নীতি সুদহার আরও কমানোর ক্ষেত্রে সতর্কতা বজায় রাখার প্রয়োজন রয়েছে।
তিন মাস অন্তর মুদ্রানীতি ঘোষণার উদ্যোগের পেছনে অর্থনীতির দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে নীতিগত সিদ্ধান্তকে আরও দ্রুত সমন্বয় করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। এতে মূল্যস্ফীতি, ঋণপ্রবাহ, বিনিয়োগ ও তারল্যের পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তুলনামূলক স্বল্প সময়ের ব্যবধানে নীতি পরিবর্তনের সুযোগ পাবে।
এদিকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকার মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার পাশাপাশি জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সামনেও মূল্যস্ফীতি কমানোর পাশাপাশি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফেরানোর চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
এ অবস্থায় আগামী তিন মাসের মুদ্রানীতিতে নীতি সুদহার, তারল্য ব্যবস্থাপনা এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক কী অবস্থান নেয়, সেদিকেই নজর থাকছে ব্যবসায়ী ও অর্থনীতি সংশ্লিষ্টদের।
আরু|



