ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের ইতিহাসে সাহস, আত্মত্যাগ আর সংগ্রামের এক উজ্জ্বল নাম প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার। চট্টগ্রামের মাটিতে বেড়ে ওঠা এই বীরকন্যা মাত্র ২১ বছর বয়সেই ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে জীবন উৎসর্গ করেন।
আজ ২৪ সেপ্টেম্বর, বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের আত্মাহুতির দিন। ১৯৩২ সালের এই দিনে পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাবে অভিযানের পর আহত অবস্থায় ধরা পড়া এড়াতে তিনি আত্মাহুতি দেন।
আগের রাতে, অর্থাৎ ২৩ সেপ্টেম্বর, তাঁর নেতৃত্বে একদল বিপ্লবী পাহাড়তলীর ইউরোপিয়ান ক্লাবে অভিযান চালায়। অভিযানের সময় প্রীতিলতা আহত হন। পরে ব্রিটিশ পুলিশের হাতে জীবিত ধরা না পড়তে তিনি সায়ানাইড গ্রহণ করেন। পরদিন সকালে ঘটনাস্থল থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ১৯১১ সালের ৫ মে চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার ধলঘাট এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা জগবন্ধু ওয়াদ্দেদার চট্টগ্রাম পৌরসভার কর্মচারী ছিলেন এবং মা প্রতিভাময়ী দেবী। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় মেধাবী ছিলেন প্রীতিলতা।
চট্টগ্রামের ডা. খাস্তগীর সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে তিনি ঢাকার ইডেন কলেজে ভর্তি হন। পরে কলকাতার বেথুন কলেজে দর্শন নিয়ে পড়াশোনা করেন এবং স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। শিক্ষাজীবন শেষে চট্টগ্রামে ফিরে একটি বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
শিক্ষকতার পাশাপাশি প্রীতিলতা যুক্ত হন ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী আন্দোলনে। তিনি মাস্টারদা সূর্য সেনের বিপ্লবী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। ১৯৩২ সালের ধলঘাটের সংঘর্ষের পর তিনি আত্মগোপনে চলে যান। পরে পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাবে অভিযানের নেতৃত্ব তাঁর হাতে আসে।
পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাবটি ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সমাজের একটি প্রতীক, যেখানে ভারতীয়দের প্রবেশে বৈষম্যমূলক নিষেধাজ্ঞা ছিল। সেই ক্লাবে অভিযান পরিচালনার মধ্য দিয়ে প্রীতিলতা ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের এক শক্তিশালী বার্তা দিতে চেয়েছিলেন। অভিযানের সময় একজন নারী নিহত হন এবং বেশ কয়েকজন আহত হন। প্রীতিলতাও গুলিবিদ্ধ হন।
শেষ পর্যন্ত পুলিশের হাতে বন্দি না হয়ে নিজের কাছে থাকা সায়ানাইড গ্রহণ করেন তিনি। মাত্র ২১ বছরের জীবনের অবসান ঘটে। কিন্তু তাঁর আত্মত্যাগ তাঁকে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের ইতিহাসে অন্যতম স্মরণীয় নারী বিপ্লবী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
প্রীতিলতার জীবন শুধু একটি আত্মাহুতির গল্প নয়; এটি ছিল একজন শিক্ষিত তরুণীর অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর গল্প। চট্টগ্রামের এই অগ্নিকন্যার সাহস ও আত্মত্যাগ আজও স্বাধীনতার ইতিহাসে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করা হয়।
আরু|



