হাম…একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ। অথচ এই রোগেই দেশের একের পর এক শিশু গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে, কেউ কেউ হারাচ্ছে প্রাণ। প্রশ্ন উঠছে, টিকা দিয়ে যে রোগ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব, সেই হামেই এবার এত শিশু কেন মৃত্যুর মুখে?
বাংলাদেশে চলমান হামের প্রাদুর্ভাবে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে ছোট শিশুরা। বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যেই সংক্রমণের হার বেশি। আর গুরুতর হয়ে ওঠা রোগীদের একটি বড় অংশের রয়েছে টিকাদানের ঘাটতি, অপুষ্টি কিংবা খুব কম বয়সের কারণে স্বাভাবিকভাবেই দুর্বল রোগ প্রতিরোধক্ষমতা।
হাম নিজে শুধু জ্বর ও শরীরে লালচে ফুসকুড়ির রোগ নয়। আক্রান্ত শিশুর শরীরে ভাইরাসের প্রভাবে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হয়ে যেতে পারে। এরপর দেখা দিতে পারে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, পানিশূন্যতা, কানের সংক্রমণ এমনকি মস্তিষ্কে প্রদাহের মতো জটিলতা। গুরুতর অবস্থায় এসব জটিলতাই শিশুর মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বিশেষ করে অপুষ্ট শিশুর ঝুঁকি অনেক বেশি। ২০২৬ সালের প্রাদুর্ভাব নিয়ে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে করা একটি গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুদের গুরুতর হামের জটিলতার সঙ্গে অপুষ্টির শক্তিশালী সম্পর্ক রয়েছে। গবেষণায় টিকা না নেওয়া শিশুদের গুরুতর জটিলতায় পড়ার ঝুঁকিও টিকা নেওয়া শিশুদের তুলনায় বেশি পাওয়া গেছে।
আরেকটি বড় সমস্যা হচ্ছে অনেক শিশু টিকা নেওয়ার বয়সেই পৌঁছাতে পারেনি।
বাংলাদেশের নিয়মিত কর্মসূচিতে হাম-রুবেলার প্রথম টিকা সাধারণত ৯ মাস বয়সে দেওয়া হয়। কিন্তু চলমান প্রাদুর্ভাবে নয় মাসের কম বয়সী শিশুরাও আক্রান্ত হচ্ছে। ফলে এসব শিশু টিকা নেওয়ার আগেই ভাইরাসের সংস্পর্শে পড়ছে।
WHO-এর প্রাথমিক বিশ্লেষণেও দেখা গেছে, আক্রান্তদের একটি বড় অংশ পাঁচ বছরের কম বয়সী এবং উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু নয় মাসের কম বয়সী।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে টিকাদানের ইমিউনিটি গ্যাপ।
WHO বলছে, ২০২৪-২৫ সময়ে MR টিকার সরবরাহ ঘাটতি, নিয়মিত টিকাদানে ফাঁক এবং ২০২০ সালের পর নিয়মিত দেশব্যাপী অতিরিক্ত হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি না হওয়ায় অনেক শিশু টিকার আওতার বাইরে থেকে গেছে। ফলে কয়েক বছরে এমন একটি শিশু জনগোষ্ঠী তৈরি হয়েছে, যাদের হাম প্রতিরোধের সুরক্ষা কম।
তবে শুধু টিকা না নেওয়াই পুরো সমস্যার ব্যাখ্যা নয়।
চট্টগ্রামে ২০২৬ সালের প্রাদুর্ভাব নিয়ে করা গবেষণায় অপর্যাপ্ত টিকাদান, মা ও শিশুর পুষ্টির ঘাটতি এবং হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়ে সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি এই তিনটি বিষয়কে হাম নিয়ন্ত্রণের বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। একই গবেষণায় অতিরিক্ত ভিড়, অপর্যাপ্ত বায়ু চলাচল এবং দরিদ্র পরিবেশকেও জটিলতার সঙ্গে সম্পর্কিত কারণ হিসেবে পাওয়া গেছে।
তাহলে এখন করণীয় কী?
প্রথমত, যেসব শিশু টিকা পায়নি বা টিকার কোনো ডোজ বাদ গেছে, তাদের শনাক্ত করে টিকার আওতায় আনতে হবে। শুধু জাতীয় পর্যায়ে মোট কত শতাংশ শিশু টিকা পেয়েছে সেটি দেখলেই হবে না। কোন এলাকায়, কোন বয়সে এবং কোন জনগোষ্ঠীর মধ্যে টিকা বাদ পড়েছে, সেটিও খুঁজে বের করতে হবে।
WHO বলছে, হাম নিয়ন্ত্রণে প্রতিটি এলাকায় উচ্চ টিকাদান কাভারেজ বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
দ্বিতীয়ত, অপুষ্ট শিশুদের দ্রুত শনাক্ত ও চিকিৎসা করতে হবে। কারণ অপুষ্টি থাকলে হাম মারাত্মক হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। তাই শুধু ভাইরাস প্রতিরোধ নয়, শিশুর পুষ্টি পরিস্থিতির দিকেও নজর দিতে হবে।
তৃতীয়ত, আক্রান্ত শিশুকে দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনতে হবে। জ্বর, কাশি, চোখ লাল হওয়া ও শরীরে ফুসকুড়ির সঙ্গে যদি শিশুর শ্বাসকষ্ট, অতিরিক্ত দুর্বলতা, খেতে না পারা, বারবার বমি বা পানিশূন্যতার লক্ষণ দেখা দেয়, তাহলে দেরি না করে হাসপাতালে নিতে হবে।
চতুর্থত, হাসপাতালগুলোতেও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ জোরদার করতে হবে। কারণ একই জায়গায় বিপুলসংখ্যক রোগী জমায়েত হলে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ে। চট্টগ্রামের গবেষণাতেও হাসপাতালভিত্তিক সংক্রমণকে একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
সবশেষে, অভিভাবকদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় টিকা নিয়ে ভুল তথ্য বা গুজবে কান না দিয়ে স্বাস্থ্যকর্মীর পরামর্শ অনুযায়ী শিশুর টিকা নিশ্চিত করা।
কারণ হাম অত্যন্ত সংক্রামক হলেও এটি প্রতিরোধযোগ্য। আর একটি শিশুকে হাম থেকে বাঁচাতে শুধু চিকিৎসা নয়, সংক্রমণের আগেই সুরক্ষা তৈরি করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
শিশুর মৃত্যু ঠেকাতে তাই এখন নজর দিতে হবে তিন জায়গায় টিকার ঘাটতি পূরণ, অপুষ্টি মোকাবিলা এবং আক্রান্ত শিশুকে দ্রুত ও নিরাপদ চিকিৎসা দেওয়া।
হাম নিয়ন্ত্রণের লড়াই শুধু হাসপাতালের নয়; পরিবার, স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও টিকাদান কর্মসূচি সবকিছুকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
আরু|



