একই ঘরে বসে আছেন দুজন। পাশে প্রিয় মানুষটি, অথচ দুজনের চোখই আটকে আছে আলাদা দুটি স্ক্রিনে। একজন স্ক্রল করছেন ফেসবুক, অন্যজন ব্যস্ত ইউটিউব বা মেসেজে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে তারা একসঙ্গেই আছেন, কিন্তু বাস্তবে তৈরি হচ্ছে এক ধরনের অদৃশ্য দূরত্ব।
প্রযুক্তি মানুষের যোগাযোগ সহজ করেছে ঠিকই, কিন্তু অতিরিক্ত ও অনুপযুক্ত ফোন ব্যবহারের কারণে কাছের মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। গবেষণায় এই আচরণকে বলা হয় ‘পার্টনার ফাবিং’ (partner phubbing) অর্থাৎ সঙ্গীর সঙ্গে কথা বলা বা সময় কাটানোর বদলে ফোনে মনোযোগ দেওয়া। বিভিন্ন গবেষণায় এমন আচরণের সঙ্গে কম সম্পর্ক-সন্তুষ্টি, কম ঘনিষ্ঠতা এবং বেশি দ্বন্দ্বের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
সঙ্গীর চেয়ে ফোন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা
দিনের কাজ শেষে বাড়ি ফিরে সঙ্গীর সঙ্গে কয়েক মিনিট কথা বলার বদলে যদি প্রথমেই ফোন হাতে নেওয়া হয়, তাহলে ধীরে ধীরে কমে যেতে পারে গুরুত্বপূর্ণ ছোট ছোট কথোপকথন।
দিন কেমন গেল, কী নিয়ে চিন্তা হচ্ছে, কোনো ভালো খবর আছে কি না এসব সাধারণ আলাপই সম্পর্কের মানসিক বন্ধন শক্ত করে। গবেষণায় দেখা গেছে, সঙ্গীর উপস্থিতিতে ফোন ব্যবহারের কারণে সরাসরি যোগাযোগের মান কমতে পারে এবং সম্পর্কের সন্তুষ্টিও কমে যেতে পারে।
কথা বলার সময়ও যদি চোখ থাকে স্ক্রিনে
আপনি গুরুত্বপূর্ণ কোনো কথা বলছেন, অথচ আপনার সঙ্গী বারবার ফোনের নোটিফিকেশন দেখছেন এই অভিজ্ঞতা খুব সহজেই ‘আমাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না’ এমন অনুভূতি তৈরি করতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ফোনের কারণে সঙ্গীর প্রতি মনোযোগ কমে গেলে মানুষ নিজেকে বাদ পড়া বা উপেক্ষিত মনে করতে পারে। এর সঙ্গে কম পারস্পরিক সাড়া এবং কম ঘনিষ্ঠতার সম্পর্কও পাওয়া গেছে।
নীরব সময়টুকুও হয়ে যাচ্ছে স্ক্রলিংয়ের সময়
সবসময় কথা বলতেই হবে এমন নয়। পাশাপাশি বসে থাকা, একসঙ্গে চা খাওয়া কিংবা কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকাও সম্পর্কের অংশ।
কিন্তু সেই নীরবতার প্রতিটি মুহূর্ত যদি ফোন স্ক্রল করার সুযোগে পরিণত হয়, তাহলে দুজনের মধ্যে থাকা স্বাভাবিক সংযোগটি ধীরে ধীরে দুর্বল হতে পারে। একই জায়গায় থেকেও দুজন আলাদা ডিজিটাল জগতে ডুবে যেতে পারেন।
ফোন নিয়ে শুরু হচ্ছে ঝগড়া
‘সবসময় ফোন নিয়ে থাকো’, ‘আমার সঙ্গে কথা বলার সময়ও ফোন ছাড়তে পারো না’ এ ধরনের অভিযোগ যদি সম্পর্কের নিয়মিত অংশ হয়ে যায়, তাহলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
২০২৫ সালের এক গবেষণায় ১০৩টি দম্পতির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, পার্টনার ফাবিংয়ের সঙ্গে দম্পতিদের যোগাযোগের নেতিবাচক ধরণ এবং সম্পর্কের সন্তুষ্টির সম্পর্ক রয়েছে।
অন্যদিকে, ১৭৩টি রোমান্টিক সম্পর্ক নিয়ে ১৪ দিনের দৈনিক পর্যবেক্ষণভিত্তিক এক গবেষণায় দেখা যায়, যেসব দিনে প্রযুক্তির কারণে দম্পতির কথাবার্তায় বেশি বাধা তৈরি হয়েছে, সেসব দিনে সম্পর্ক নিয়ে খারাপ অনুভূতি, প্রযুক্তি নিয়ে দ্বন্দ্ব এবং নেতিবাচক মেজাজ বেশি দেখা গেছে।
অপরিচিত মানুষের জীবন জানা, অথচ সঙ্গীর খবর অজানা
সোশ্যাল মিডিয়ায় কে কী পোস্ট করলেন, কোন তারকা কোথায় গেলেন কিংবা বন্ধুর জীবনে কী ঘটছে এসবের খবর আমরা নিয়মিত রাখি। কিন্তু একই সময়ে পাশে থাকা মানুষটি কী নিয়ে চিন্তিত, তার কী ইচ্ছা বা প্রত্যাশা, কিংবা আজকের দিনটি তার কেমন গেল সেটা জানার সময় কি আমরা দিচ্ছি?
সম্পর্কে সবচেয়ে বড় সমস্যা অনেক সময় ফোনটি নিজে নয়; বরং ফোনের কারণে প্রিয় মানুষটির প্রতি মনোযোগ কমে যাওয়া।
গবেষণা কী বলছে?
২০২৫ সালের একটি বড় মেটা-অ্যানালাইসিসে ৫২টি গবেষণা ও ৫৮টি নমুনার প্রায় ১৯,৭০০ মানুষের তথ্য পর্যালোচনা করা হয়। এতে পার্টনার ফাবিংয়ের সঙ্গে সম্পর্কের সন্তুষ্টি, দাম্পত্য সন্তুষ্টি, রোমান্টিক সম্পর্কের মান ও ঘনিষ্ঠতার নেতিবাচক সম্পর্ক পাওয়া যায়। একই সঙ্গে পার্টনার ফাবিংয়ের সঙ্গে দ্বন্দ্ব ও ঈর্ষারও সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
আরেকটি ২০২৫ সালের গবেষণায় দেখা যায়, সঙ্গীর ফোনে উপেক্ষিত হওয়ার সঙ্গে বিশ্বাস ও সম্পর্কের মান কমে যাওয়ার সম্পর্ক রয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত সম্পর্কের সন্তুষ্টিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে ফোন ব্যবহার করলেই সম্পর্ক নষ্ট হবে। মূল বিষয় হলো- ফোনের ব্যবহার কখন সঙ্গীর প্রাপ্য মনোযোগকে সরিয়ে দিচ্ছে।
তাই একই ঘরে থেকেও যদি দুজনের চোখ থাকে দুটি আলাদা স্ক্রিনে, কথা বলার সময়ও যদি ফোন হাত থেকে নামতে না চায়, কিংবা একে অপরের চেয়ে ভার্চুয়াল জগত বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে তাহলে সম্পর্কের জন্য সেটি একটি সতর্ক সংকেত হতে পারে।
কারণ সম্পর্ক টিকে থাকে শুধু পাশাপাশি থাকার মাধ্যমে নয়; মনোযোগ, কথা বলা, শোনা এবং একে অপরকে গুরুত্ব দেওয়ার মধ্য দিয়েই তৈরি হয় প্রকৃত কাছাকাছি থাকা।
আরু|খব



