back to top

রবিবার, ২১শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৭ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিশ্ব সাহিত্যিক ম্যাক্সিম গোর্কির স্মরণে কিছু কথা-মো. কামাল উদ্দিন

kbctgbd

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ

 

 

ম্যাক্সিম গোর্কির আজ ১৮ই জুন ৮৮ তম প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে এই লেখককে স্মরণ করার পাশাপাশি তার লেখা বিখ্যাত উপন্যাস “মা” থেকে কিছু সুন্দর উক্তি দিয়ে লেখা শুরু করছি- “মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়, আর তার স্বপ্নের ওপর তার জীবন নির্ভর করে।””প্রেম হলো জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি, যা সবকিছু জয় করতে পারে। “মানুষের মনে আশা জাগানো, তাকে সাহস জোগানো আমাদের সবচেয়ে বড় কর্তব্য।” “বিপ্লবের জন্য ভালোবাসা এবং মানবতার জন্য শ্রদ্ধা অপরিহার্য।” “প্রকৃত ভালোবাসা হলো, যেখানে কোনো স্বার্থ নেই, নেই কোনো শর্ত।”

 

এই উক্তিগুলি ম্যাক্সিম গোর্কির মানবতা ও বিপ্লবের প্রতি গভীর বিশ্বাস এবং তার উপন্যাসের মূল বার্তা প্রকাশ করে। মুল লেখাতে যাওয়ার আগে এই মহান লেখকের লেখার বইয়ের তালিকাটা একটু দেখার দরকার–

 

আমাকে অনেকে বই খোঁড় বলে, আমি বই যা পায় তা খায়- জীবনে কতপরিমাণ বই পড়েছি তার সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলে-ও আনুমানিক লক্ষাধিক বই পড়েছি।এখনো পড়ি, আমার বাসা ও অফিসটাতে ছোটখাটো লাইব্রেরি রয়েছে। বই পড়তে গেয়ে কত ধরণের যে বই পড়েছি তা সঠিকভাবে বলা সম্ভব নয়, যেই লেখকই হোক না কেন বই হাতের কাছে পেলেই বই পড়ে নিতাম, তবে পৃথিবীতে সব চেয়ে বেশি বই পড়েন রুশ জাতি,তাঁরা বই বেশি পড়েন এবং বই বেশি সংগ্রহ করেন, আমি সেই রুশ লেখক ম্যাক্সিম গোর্কির মা উপন্যাসটা সব চেয়ে পড়েছি, সেই মা উপন্যাস নিয়ে কিছু বলতে হয়।

 

ম্যাক্সিম গোর্কির “মা” উপন্যাসটি রুশ বিপ্লবের প্রেক্ষাপটে রচিত একটি সমাজতান্ত্রিক ধাঁচের সাহিত্যকর্ম। ১৯০৬ সালে প্রকাশিত এই উপন্যাসটি মূলত একটি শ্রমিক পরিবারকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র পেলাগেয়া নিলভনা ভ্লাসোভা, যিনি একজন শ্রমিকের স্ত্রী এবং পাভেল নামের এক যুবকের মা। পাভেল শ্রমিক আন্দোলনের সাথে যুক্ত হয়ে বিপ্লবী কার্যকলাপে অংশ নেয়, যা মাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। পেলাগেয়া প্রথমে তার ছেলের বিপ্লবী কার্যকলাপে ভীত থাকলেও, ধীরে ধীরে তিনিও বিপ্লবী আদর্শের প্রতি আকৃষ্ট হন এবং নিজে সক্রিয়ভাবে আন্দোলনে যোগ দেন। গোর্কি এই উপন্যাসের মাধ্যমে শ্রমিক শ্রেণীর সংগ্রাম, তাদের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষার প্রতিচ্ছবি তুলে ধরেছেন। উপন্যাসটি মা এবং ছেলের সম্পর্কের মাধ্যমেও একটি বৃহত্তর সামাজিক পরিবর্তনের আহ্বান জানায়। “মা” উপন্যাসটি রুশ সাহিত্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে এবং এটি বিশ্বের নানা ভাষায় অনূদিত হয়েছে। এটি শ্রমিক শ্রেণীর সংগ্রামের প্রতীক হয়ে ওঠেছে এবং সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের প্রেরণা জুগিয়েছে।

 

মা, শব্দটি শুনলেই মনে হয় এক অনির্বচনীয় ভালোবাসা, স্নেহ ও মমতার কথা। মা এমন একটি অবিচলিত শক্তি, যিনি নিঃস্বার্থভাবে সবটুকু দিয়ে সন্তানকে গড়ে তোলেন। মায়ের ভালোবাসা কোনো শর্ত ছাড়াই সন্তানকে ঘিরে থাকে, সন্তান যতই দূরে থাকুক না কেন, মায়ের মন সর্বদা তার সন্তানদের নিয়ে ব্যস্ত। মায়ের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের শুরু সেই মুহূর্ত থেকেই, যখন আমরা মায়ের গর্ভে প্রথম প্রাণের সঞ্চার অনুভব করি। মা-ই প্রথম আমাদের ক্ষুধার্ত মুখে খাবার তুলে দেন, প্রথম হাঁটতে শেখান, প্রথম কথা বলাতে সহায়তা করেন। আমাদের জীবনের প্রতিটি ছোট-বড় প্রয়োজনে মা আমাদের পাশে থাকেন। তাঁর সাহচর্য ও শিক্ষার মধ্যেই আমরা আমাদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশ লাভ করি।

 

মায়ের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক কেবলমাত্র দৈহিক বা মনস্তাত্ত্বিক নয়, এটি এক আধ্যাত্মিক সম্পর্কও বটে। মায়ের কাছে প্রতিটি সন্তানই সমান, কিন্তু প্রতিটি সন্তানের কাছে তার মা সবচেয়ে প্রিয়, সবচেয়ে আপন। মায়ের ভালোবাসা আমাদের জীবনের সব দুঃখ-দুর্দশাকে মোকাবিলা করার শক্তি দেয়। তাঁর এক টুকরো হাসি আমাদের সব কষ্ট ভুলিয়ে দেয়, তাঁর একটুখানি সান্ত্বনা আমাদের সব দুঃখ মুছে দেয়। জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে মা আমাদের সঙ্গে আছেন, আমাদের সফলতার পেছনে তাঁর অনুপ্রেরণা। আমাদের ব্যর্থতার সময় তিনি আমাদের সাহস জোগান।

 

তাঁর অশ্রু ও তার হেসে ওঠা প্রতিটি মুহূর্তেই আমরা খুঁজে পাই নতুন উদ্যম, নতুন আশা। মা কেবল একটি শব্দ নয়, এটি একটি অনুভূতি, একটি আবেগ, একটি সম্পর্ক যা জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আমাদের সঙ্গে থাকে। মা’র ভালোবাসা হলো সেই আলো, যা আমাদের জীবনের সমস্ত অন্ধকারকে দূর করে দেয়, আমাদের পথ দেখায় সঠিক গন্তব্যে। মা আমাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক, সেরা বন্ধু, এবং সর্বোত্তম সাথী। মা, তোমার জন্য কোন ভাষাতেই যথেষ্ট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা সম্ভব নয়। তোমার নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও স্নেহের প্রতিদান আমরা কোনোদিনই দিতে পারবো না, তবে আমরা চেষ্টা করবো তোমার প্রতি সৎ ও সম্মানিত থাকতে। মা, তোমার জন্য অন্তহীন ভালোবাসা।

 

বিশ্বসাহিত্যের এক কালজয়ী কথাশিল্পী ম্যাক্সিম গোর্কির ৮৮তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। তার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।কিংবদন্তি এই সাহিত্যিক পরিবর্তনের বাঁকগুলো তুলে ধরেছেন নিখুঁতভাবে। মাত্র ১১ বছর বয়সে অনাথ হয়ে যান অ্যালেক্সি ম্যাক্সিসোভিচ পেশকভ। তিনি সেই বিখ্যাত রুশ লেখক, বিশ্বের কাছে যিনি পরিচিত ‘ম্যাক্সিম গোর্কি’ নামে। এ নামটি ছিল তার ছদ্মনাম। তবে ছদ্মনামেই তিনি ছিলেন বিশ্ববিখ্যাত। ‘গোর্কি’ শব্দের অর্থ হলো ‘তিক্ত’। এই নামকরণের পেছনে কারণ অবশ্য আছে- জীবনটাই ছিল তার কাছে তেতো, বিস্বাদময়।

 

১৮৬৮ সালের ২৮ মার্চ রাশিয়ার নিঝনি নভগোরোদে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি ছিলেন বাবা-মায়ের প্রথম সন্তান। প্রথমে চিরতরে হারান বাবা ম্যাক্সিম পেশকভকে। বাবার মৃত্যুর পর গোর্কির আশ্রয় হয় মামার বাড়িতে। দাদির কাছেই তিনি বেড়ে ওঠেন গল্প শুনতে শুনতে। ভর্তি হন স্থানীয় স্কুলে। মা ভারভারা পেশকভা দ্বিতীয় বিয়ে করেন তার চেয়ে ১০ বছরের ছোট এক অকর্মন্য ব্যক্তিকে। পরের বিয়েটা মোটেও সুখের ছিল না। এর কিছুদিন পরেই ক্ষয়রোগে মারা গেলেন মা।মায়ের হঠাৎ মৃত্যুর পর গোর্কির ভরণ পোষণের দায়িত্ব এসে পড়ে দাদার ওপর। দাদা আর গোর্কির দায়িত্বভার নিতে চাইলেন না। মায়ের শেষকৃত্যের কয়েকদিন পরেই গোর্কিকে ডেকে স্পষ্ট বলে দেন, ‘তোমাকে এভাবে গলায় মেডেলের মতো ঝুলিয়ে রাখব তা তো চলতে পারে না। এখানে আর তোমার জায়গা হবে না। এবার তোমার দুনিয়ার পথে-প্রান্তরে বেরুনোর সময় হয়েছে।’

 

দাদার বাড়ি থেকে বিতাড়িত হওয়ার পর সেই শিশু বয়সেই গোর্কিকে চাকরি নিতে হয় একটি জুতার দোকানে। শহরের সদর রাস্তার ওপর এক শৌখিন জুতার দোকানের কর্মচারী হন তিনি। সারা দিন হাড়ভাঙা পরিশ্রম। পরিশ্রমকে তিনি মনে করতেন পুরুষের অলংকার স্বরূপ। একদিন দোকানের চাকরি ছেড়ে দিলেন তিনি। সে সময় জারের আমলে যাদের নির্বাসন দেওয়া হতো, তাদের নিয়ে যাওয়া হতো জাহাজে করে। সেই জাহাজের কর্মচারীদের বাসন ধোয়ার কাজ নেন গোর্কি। ভোর ৬টা থেকে মাঝরাত অবধি কাজ। তারই ফাঁকে ফাঁকে দুই চোখ ভরে দেখতেন নদীর অপরূপ দৃশ্য। দুই পারের গ্রামের ছবি। হিসাবপত্র মিটিয়ে হাতে আট রুবল নিয়ে ফিরে এলেন নিজের শহর নিঝনি নভগোরোদে। অবশেষে প্রিয়তম দাদির মৃত্যু গোর্কিকে করে তোলে চরম শোকবিহ্বল।

 

মাত্র ১২ বছর বয়সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান নিরুদ্দেশে। জীবনের এক পর্যায়ে হতাশ হয়ে ব্যর্থ চেষ্টা করেন আত্মহত্যার। ১৯ বছর বয়সে নদীর তীরে গিয়ে গুলি করেন নিজের বুকে। ঘটনাচক্রে বেঁচে যান তিনি। ঘটনাটি একটু বিস্তারিত জানা যাক, বিশ্ব যখন অস্থির সময় পার করছিল, ঠিক তখন রাশিয়ায় চলছিল জারের রাজত্বকাল। দেশজুড়ে চলছিল শাসনের নামে শোষণ অত্যাচার। বিপ্লবী দলের সঙ্গে যুক্ত হয়েই গোর্কি পরিচিত হলেন কার্ল মার্কসের রচনাবলির সঙ্গে। অর্থনীতি, ইতিহাস, সমাজনীতি, দর্শন, আরো নানা বিষয়ের বই পড়তে আরম্ভ করলেন তিনি। দারিদ্র্য ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী। কিছুদিন পর একটি রুটির দোকানে কাজ পেলেন। সন্ধ্যা থেকে পরদিন দুপুর অবধি একটানা কাজ করতে হতো তাকে। তারই ফাঁকে যেটুকু সময় পেতেন, বই পড়তেন।

 

বাস্তব জীবনের পরতে পরতে তিনি কষ্টকে, পরিশ্রমকে বন্ধুর মতোই দেখেছেন নিত্যসঙ্গী হিসেবেই। তার এই সময়কার জীবনে অভিজ্ঞতার কাহিনী অবলম্বনে পরবর্তীকালে লিখেছিলেন বিখ্যাত গল্প ‘ছাবিবশজন লোক আর একটি রুটি’। সেই রুটির কারখানায় কাজ করার সময় পুলিশের দৃষ্টি পড়েছিল তাঁর ওপর। সুকৌশলে নিজেকে বাঁচিয়ে চলতেন গোর্কি। হাড়ভাঙা পরিশ্রম করতে করতে মনের সব শক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন তিনি। তার ওপর যখন সন্দেহ-অবিশ্বাস; নিজের ওপরেই সব বিশ্বাসটুকু হারিয়ে ফেলতেন। মনে হতো এই জীবন মূল্যহীন, বেঁচে থাকার কোনো অর্থ নেই। এই মনে করেই তিনি বাজার থেকে কিনলেন একটি পিস্তল।

 

১৮৮৭ সালের ১৪ ডিসেম্বর নদীর তীরে গিয়ে নিজের বুকে গুলি করলেন। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে নিয়ে যাওয়া হয় হাসপাতালে। চিকিৎসকরা জীবনের আশা ত্যাগ করলেও অদম্য প্রাণশক্তির জোরে বেঁচে যান গোর্কি। এদিকে এক বৃদ্ধ বিপ্লবী মাঝেমধ্যে আসতেন সেই রুটির কারখানায়। সুস্থ হয়ে উঠতেই গোর্কিকে তিনি নিয়ে গেলেন নিজের গ্রামের বাড়িতে। ঘুরতে ঘুরতে এলেন নিজের ক্যাসপিয়ান সাগরের তীরে এক ছোট্ট শহরে। কোথাও বেশিদিন থাকতে মন চায় না। রেলে পাহারাদারির কাজ নিয়ে এলেন নিজের পুরোনো শহর নিঝনি নভগোরোদে। এই সময়ে কিছু কবিতা রচনা করেছিলেন গোর্কি। নাম দেন ‘পুরোনো ওকের গান’। দুজন বিপ্লবীর সঙ্গে পরিচয় ছিল তার।

 

সে জন্য পুলিশ তাকে বন্দি করল। কিন্তু যথাযথ প্রমাণের অভাবে কিছুদিন পর ছেড়ে দিল তাকে। প্রায় দুই বছর সেখানে রয়ে গেলেন তিনি। ফিরে যাই, সেই শৈশবে। মাত্র ১২ বছর বয়সে পাঁচ বছর তিনি পায়ে হেঁটে ভ্রমণ করেন রাশিয়ার বিভিন্ন জায়গা। বহু চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে বড় হয়েছেন তিনি। এ সময় বিভিন্ন চাকরির অভিজ্ঞতা ও নানা ঘটনার স্মৃতি তার পরবর্তী সময়ের লেখালেখিতে প্রভাব ফেলে। জীবনে বহু তিক্ত অভিজ্ঞতার অধিকারী গোর্কি চাকরি করতে গিয়ে কখনো হয়েছেন প্রহৃত, লাঞ্ছিত। অনেক সময় খাবারও জুটত না তার। এ তিক্ত অভিজ্ঞতার আলোকেই এমন ছদ্মনাম রাখা।

 

আগেই বলেছি, ম্যাক্সিম গোর্কির ছিল বই পড়ার প্রচুর নেশা। রাজনীতি, অর্থনীতি, ইতিহাস, সমাজনীতি, দর্শন প্রভৃতি বিষয়ে তার আগ্রহ ছিল বেশ। একদিন হাতে এল রুশ কবি পুশকিনের একটি কবিতার বই। একনিষ্ঠভাবে পড়লেন সেটি। পড়তে পড়তে বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে গেলেন তিনি। রাজনৈতিক কারণে তাঁকে কারাবরণ করতে হয় একাধিকবার। কাটাতে হয় নির্বাসিত জীবনও। সেই গোর্কির সঙ্গে ১৯০২ সালে ভ্লাদিমির ইলিচ উলিয়ানভ, যার ছদ্মনাম লেনিন, তার সঙ্গে গড়ে ওঠে ব্যক্তিগত সখ্য।

 

আক্ষরিক অর্থে গোর্কি ছিলেন তার নামের মতোই তিক্ত। তার লেখায় সব সময় ফুটে উঠেছে তিক্ত সত্য। রাশিয়ার জীবনযাত্রার বিরুদ্ধে সঞ্চিত রাগের প্রকাশ দেখা যায় তার লেখায়। গোর্কির প্রথম বই ‘এসেস অ্যান্ড স্টোরিস’ প্রকাশিত হয় ১৮৯৮ সালে। প্রথম বইটি সাড়া জাগিয়েছে সারা দেশে। লেখক হিসেবে ম্যাক্সিম গোর্কির জয়যাত্রা শুরু হয়। রাশিয়ার সমাজের নিচু স্তরের মানুষগুলোর জীবনের প্রতিচ্ছবি এঁকেছেন তিনি। রাশিয়ার সামাজিক, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের বাঁকগুলো তিনি এঁকেছেন নিখুঁতভাবে।

 

শ্রমিকদের সঙ্গে গোর্কির ছিল ঘনিষ্ঠতম সম্পর্ক। ১৯০২ সাল থেকে গোর্কি ছিলেন লেনিনের ঘনিষ্ঠতমদের একজন। ১৯০০ থেকে ১৯০৫ সাল পর্যন্ত গোর্কির লেখায় আশাবাদের ব্যঞ্জনা উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। ১৯০৬ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফরে যান তিনি। সেখানে তিনি রচনা করেন বিখ্যাত কালজয়ী উপন্যাস ‘মা’। ১৯০৬ থেকে ১৯১৩ সাল পর্যন্ত গোর্কি ছিলেন ক্যাপ্রিতে। ১৯১৩ সালে সাধারণ ক্ষমার আওতায় তিনি আবার ফিরে আসেন রাশিয়ায়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় গোর্কির ঘরটি হয়ে উঠেছিল বলশেভিকদের অফিসঘর। রুশ বিপ্লবের পর গোর্কি ছিলেন ইতালিতে। ১৯৩২ সালে স্টালিনের আহ্বানে গোর্কি রাশিয়ায় ফিরে আসেন। তাকে ভূষিত করা হয় অর্ডার অব লেনিন উপাধিতে।

 

‘মা’ উপন্যাসের জন্য গোর্কি জগদ্বিখ্যাত। যদিও মা ছেলের সম্পর্কই উপন্যাসটির মূল বিষয়। একটি সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের জন্য তৈরি হতে থাকা রাশিয়ার রাজনীতির পরিস্থিতি বস্তুনিষ্ঠভাবে উপস্থাপন করার কারণে এই ঔপন্যাসিক বিশ্বসাহিত্যে বিশেষ স্থান ও প্রশংসা পাওয়ার দাবি রাখেন, যা তিনি ন্যায্যভাবেই পেয়েছেন। ‘মা’ উপন্যাসটির সামাজিক মূল্য এককথায় তুলনাহীন। একটি উপন্যাস একটি জাতির বিবেককে বদলে দিয়েছে ব্যাপকভাবে। পেলাগেয়া নিলভনা নামের একজন অতি সাধারণ ‘মেয়ে মানুষ’ কী করে সময়ের প্রয়োজনে আস্তে আস্তে রূপান্তরিত হন একজন রাজনীতি সচেতন ‘ব্যক্তি’তে; বুঝতে শেখেন সারা জীবন কী করুণ কাটিয়েছেন, হয়েছেন শ্রেণিগত নির্যাতন ও লিঙ্গগত অবস্থানের অসহায় শিকার- সেসবের চমৎকার বর্ণনা করেছেন গোর্কি, দুর্দান্ত ছিল তার ভাষারীতি।

 

সোভিয়েত ইউনিয়নে ‘সোশ্যাল রিয়েলিজম’ নামে যে সাহিত্যিক ধারার সূচনা হয়েছিল সেটার প্রতিষ্ঠাতা গোর্কি। তুচ্ছের মধ্যেই নাকি বৃহৎ কিছু খুঁজে নিতে হয়। আর সে কারণে বোধহয় কোনো বিষয়-বস্তুকেই কখনোই তিনি অবহেলা বা তুচ্ছের চোখে দেখেননি। উনিশ শতকে বিশ্বসাহিত্যে যে কয়েকজন হাতেগোনা সাহিত্যিক বিশ্বসাহিত্যে ঝড় তুলেছেন ম্যাক্সিম গোর্কি তাদের মধ্যে অন্যতম। যদিও তিনি উপন্যাসের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি পেয়েছেন, তারপরও তার গল্পগ্রন্থগুলো তাকে সত্যিকারের গোর্কি হয়ে উঠতে অসামান্য অবদান রেখেছে। সমকালীন বাস্তবতা, সমাজের নিচুতলার মানুষই ছিল তার গল্পের উপজীব্য বিষয়।

 

মূলত প্রথম দিকে তিনি লিখতেন প্রথাগত নিয়মে। পরবর্তী সময়ে তার সঙ্গে পরিচয় হয় তরুণ লেখক ভ্লাদিমির করোলেঙ্কার। করোলেঙ্কার কথায় চেতনা ফিরে পেলেন গোর্কি। প্রথাগত চেতনার ধারাকে বাদ দিয়ে শুরু হলো তার নতুন পথের যাত্রা। সমাজের নিম্ন শ্রেণির মানুষেরা- চোর, লম্পট, ভবঘুরে, মাতাল, বেশ্যা, চাষি, মজুর, জেলে, সারিবদ্ধভাবে প্রকাশ পেতে থাকে তার রচনায়। এই পর্বের কয়েকটি বিখ্যাত গল্প হলো মালভা, বুড়ো ইজরেগিল, চেলকাশ, একটি মানুষের জন্ম। গল্পগুলোতে একদিকে যেমন ফুটে উঠেছে নিচুতলার মানুষের প্রতি গভীর মমতা, অন্যদিকে অসাধারণ বর্ণনা, কল্পনা আর তার সৃজনশক্তি।

 

এসব লেখার বেশির ভাগই ছাপা হয়েছিল ভলগা তীরের আঞ্চলিক পত্রিকায়। স্থানীয় মানুষ, কিছু লেখক, সমালোচক তার লেখা পড়ে মুগ্ধ হলেন। তখনো যশখ্যাতি পাননি গোর্কি। ১৮৯৮ সালে তার প্রবন্ধ ও গল্প নিয়ে একটি ছোট সংকলন প্রকাশিত হলো। এই বই প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল গোর্কির নাম। এর পেছনেও আছে একটি গল্প। আত্মহত্যার ব্যর্থ চেষ্টার পর কুলঝানি নামে এক ভদ্রলোক গোর্কিকে নিয়ে গেলেন স্থানীয় পত্রিকা অফিসে। নিজের নাম সই করার সময় ‘আলেক্সি পেশকভ’-এর পরিবর্তে লেখালেন ম্যাক্সিম গোর্কি। গল্পটি প্রকাশিত হলো ১৮৯২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। এই গল্পে বাস্তবতার চেয়ে রোমান্টিকতার প্রভাবই ছিল বেশি। ‘এমিলিয়ান পিলিইয়াই’ গল্প পড়ে জ্যেষ্ঠ সাহিত্যিক ভ্লাদিমির গালাক্কিওনচিভচ করলিয়েনক উৎসাহ দেওয়ার পর ‘চেলকাশ’ গল্প যখন কাগজে বেরুল, তখন গোর্কিকে তিনি প্রস্তাব দেন সাংবাদিকতার চাকরির। সামারার একটি বড় কাগজে চাকরি, মাস গেলে ১০০ রুবল আসবে। গোর্কিও সানন্দে রাজি হয়ে গেলেন।

 

১৮৯২ সালের ১২ সেপ্টেম্বর শনিবারের কথা। তিফলিস শহর থেকে প্রকাশিত দৈনিক সংবাদপত্র ‘ককেশাস’-এ ছাপা হলো একটি গল্প : মাকার চুদ্রা। লেখকের নাম এম গোর্কি। এরপর অনেক পত্রিকায় ক্রমে ক্রমে ছাপা হতে থাকে লেখা– যেমন ভোলগা সংবাদপত্র, দৈনিক সামারা, ওদেসা সংবাদ,নিঝেগরোদপত্র ইত্যাদি। ১৯১৫ সালে তিনি নিজেই লিয়েতপিস (কড়চা) পত্রিকা প্রকাশ করেন এবং ১৯২১ থেকে তার সম্পাদনায় বেরুনো শুরু হয় পত্রিকাটি।

 

হ্যাঁপ্রয়োজন নেই মন্তব্য করতে গিয়ে গেয়র্গি লুকাস বলেন, ‘লেখক হিসেবে গোর্কি সর্বদাই তার সমকালীন ঘটনাবলির প্রতি বিশ্বস্ত থেকেছেন এবং নিজের রচনার মধ্যে এমন ভেদরেখা টেনে দেননি যাতে কতটুকু একজন সাহিত্যিকের লেখা আর কতটুকু একজন বিপ্লবী সাংবাদিক ও প্রচারকর্মীর লেখা, তা ধরা যায়। সত্য এর বিপরীতটাই। তার মহত্তম সাহিত্যকীর্তি সর্বদা সাংবাদিকতাকে আশ্রয় করে উত্থিত হয়েছে।’ ১৯২১ সালে হঠাৎই যক্ষ্মায় আক্রান্ত হন ম্যাক্সিম গোর্কি। উন্নত চিকিৎসার জন্য লেনিন তাকে পাঠান জার্মানিতে। দুই বছর সেখানে কাটিয়ে ১৯২৪ সালের এপ্রিলের প্রথমে গেলেন তার প্রিয় জায়গা ক্যাপ্রিতে, পরে সেখান থেকে সোরেন্তো ফেরেন, ১৯২৮ সালে। তখনো তিনি ভালোমতো সেরে ওঠেননি। চিকিৎসারত অবস্থায় ৬৮ বছর বয়সে ১৯৩৬ সালের ১৮ জুন রাশিয়ার মস্কোতে আকস্মিক

 

ভাবে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন কালজয়ী এই সাহিত্যিক। মৃত্যুর আগে তিনি বলেছিলেন, ‘যুদ্ধ আসছে … তোমরা তৈরি থেকো।’ এই লেখককের লেখা বই গুলো দেখার প্রয়োজন-

 

ম্যাক্সিম গোর্কি একজন প্রখ্যাত রুশ সাহিত্যিক ছিলেন এবং তিনি অনেক উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্ম রচনা করেছেন। তার লেখা বইয়ের সংখ্যা বেশ উল্লেখযোগ্য। এখানে তার কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজের তালিকা দেয়া হলো:উপন্যাস: “মা”১০০৬ সাল “দ্য আউটকাস্ট” ১৮৯৯”ফোমা গর্দেয়েভ” ১৮৯৯”দ্য লাইফ অব ক্লিম সামগিন”১৯২৫-১৯৩৬

 

গল্প সংকলন: “আর্কিপেলাগ কালুগা”১৮৯৮”টুয়েন্টি সিক্স মেন অ্যান্ড এ গার্ল” ১৮৯৯ “চেলকাশ” ১৮৯৫”দ্য সোং অফ দ্য স্টর্মি পেট্রেল”১৯০১

 

নাটক: “দ্য লোয়ার ডেপথস”১৯০২ “এনেমিস”১৯০৬ “দ্য বার্থ অব এ ম্যান” ১৯০৯প্রবন্ধ ও স্মৃতিকথা:”মাই চাইল্ডহুড” ১৯১৩-১৯১৪ “ইন দ্য ওয়ার্ল্ড” ১৯১৬

 

“মা ইউনিভার্সিটিস” ১৯২৬গোর্কির লেখা বইয়ের সংখ্যা বেশ কয়েক ডজন এবং তিনি অনেক ছোটগল্প, প্রবন্ধ, এবং নাটক রচনা করেছেন। তার রচনাবলী রাশিয়ার সাহিত্য এবং বিশ্ব সাহিত্য উভয় ক্ষেত্রেই অসাধারণ প্রভাব বিস্তার করেছে।

 

লেখক: সাংবাদিক গবেষক টেলিভিশন উপস্থাপক ও মহাসচিব, চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরাম।

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল খবরবাংলা২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন info@khaborbangla24.com ঠিকানায়।

কাতারের সড়কে ঝরে গেল ৫ বাংলাদেশির প্রাণ

মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কাতারে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় পাঁচ বাংলাদেশিসহ মোট...

সন্তানের জীবনের নীরব বটবৃক্ষ: আজ বিশ্ব বাবা দিবস

আজ বিশ্ব বাবা দিবস। প্রতি বছর জুন মাসের তৃতীয়...

সামনে আসবি না, মাইরা ফালামু’—পুলিশকে যুবলীগের হুমকি

গাজীপুরে প্রকাশ্যে পুলিশের উদ্দেশে প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছেন যুবলীগ–এর এক...

ডিবি হেফাজতে নেওয়ার ৫ ঘণ্টা পর ছাত্রলীগ কর্মীর মৃত্যু

ফরিদপুরের গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের হাতে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের কর্মী...

ছেলের বিশ্বকাপ অভিযান এবার মাঠে বসেই দেখবেন মা

স্পেনের বিপক্ষে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করে বিশ্বকাপের আলোচনায় উঠে আসা...

কাতারের সড়কে ঝরে গেল ৫ বাংলাদেশির প্রাণ

মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কাতারে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় পাঁচ বাংলাদেশিসহ মোট...

সন্তানের জীবনের নীরব বটবৃক্ষ: আজ বিশ্ব বাবা দিবস

আজ বিশ্ব বাবা দিবস। প্রতি বছর জুন মাসের তৃতীয়...

সামনে আসবি না, মাইরা ফালামু’—পুলিশকে যুবলীগের হুমকি

গাজীপুরে প্রকাশ্যে পুলিশের উদ্দেশে প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছেন যুবলীগ–এর এক...

ডিবি হেফাজতে নেওয়ার ৫ ঘণ্টা পর ছাত্রলীগ কর্মীর মৃত্যু

ফরিদপুরের গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের হাতে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের কর্মী...

ছেলের বিশ্বকাপ অভিযান এবার মাঠে বসেই দেখবেন মা

স্পেনের বিপক্ষে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করে বিশ্বকাপের আলোচনায় উঠে আসা...

সর্বশেষ

কাতারের সড়কে ঝরে গেল ৫ বাংলাদেশির প্রাণ

মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কাতারে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় পাঁচ বাংলাদেশিসহ মোট...

সন্তানের জীবনের নীরব বটবৃক্ষ: আজ বিশ্ব বাবা দিবস

আজ বিশ্ব বাবা দিবস। প্রতি বছর জুন মাসের তৃতীয়...

সামনে আসবি না, মাইরা ফালামু’—পুলিশকে যুবলীগের হুমকি

গাজীপুরে প্রকাশ্যে পুলিশের উদ্দেশে প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছেন যুবলীগ–এর এক...

ডিবি হেফাজতে নেওয়ার ৫ ঘণ্টা পর ছাত্রলীগ কর্মীর মৃত্যু

ফরিদপুরের গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের হাতে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের কর্মী...