সমুদ্রের ভাঙনে ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে বাবার কবর। হয়তো আর কিছুক্ষণ পরই মাটির সঙ্গে শেষ সংযোগটুকুও হারিয়ে যাবে। তাই কবরটি পুরোপুরি বিলীন হয়ে যাওয়ার আগে শেষবারের মতো সেখানে দাঁড়িয়ে জিয়ারত করছেন এক ছেলে। বাবার কবরের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা নয়, বরং হারিয়ে যেতে বসা সেই শেষ স্মৃতিচিহ্নের সঙ্গে বিদায়ের মুহূর্ত, এমনই এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য ধারণ করেছেন আলোকচিত্রী ডা. ইমরান পারভেজ।
জলবায়ু পরিবর্তন ও সমুদ্রের ভাঙনে মানুষের জীবনে নেমে আসা অপূরণীয় ক্ষতির প্রতীক হয়ে ওঠা ছবিটি এবার জিতে নিয়েছে সেরা আলোকচিত্রের পুরস্কার। রাজধানীর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির চিত্রশালায় ‘Waves of Life’ শিরোনামে আয়োজিত সমুদ্র ও উপকূলবিষয়ক জাতীয় আলোকচিত্র প্রতিযোগিতা ও প্রদর্শনীতে দর্শক ভোট ও বিচারকমণ্ডলীর বিবেচনায় সেরা নির্বাচিত হয় ছবিটি।
গত ১৮ অক্টোবর শুরু হওয়া পাঁচ দিনব্যাপী এ প্রদর্শনীর শেষ দিন বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) পুরস্কার বিতরণের মধ্য দিয়ে আয়োজনের পর্দা নামে। প্রদর্শনীতে ছবিটি দেখতে এসে অনেক দর্শনার্থী আবেগাপ্লুত হন।
তাঁদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিপূরণ হিসেবে অর্থ পাওয়া গেলেও বাবার কবরের মতো পারিবারিক স্মৃতিচিহ্ন হারানোর ক্ষতি কোনো অর্থেই পূরণ করা সম্ভব নয়।
ছবিটি তোলার পেছনের গল্প জানাতে গিয়ে আলোকচিত্রী ডা. ইমরান পারভেজ বলেন, ছবিটি সম্ভবত ২০২১ বা ২০২২ সালে তোলা। তখন তিনি ভাষানচরের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে একটি বেসরকারি সংস্থায় চাকরি করতেন। যাতায়াতের পথে বিভিন্ন স্থানের ছবি তুলতেন তিনি।
একদিন ভাষানচরে যাওয়ার পথে নোয়াখালীর জনতাঘাট এলাকায় ছবি তোলার সময় তাঁর চোখে পড়ে সমুদ্রের ভাঙনে বিলীন হতে থাকা একটি কবরস্থান। সেখানে একাধিক কবর থাকলেও সাগরের গ্রাসে ধীরে ধীরে সেগুলো হারিয়ে যাচ্ছিল। এ সময় তিনি দেখতে পান, এক ছেলে সমুদ্রের দিকে এগিয়ে থাকা কবরটির পাশে দাঁড়িয়ে জিয়ারত করছেন। কবরটির শেষ অংশটুকু তখনো মাটির সঙ্গে যুক্ত ছিল। কিছুক্ষণ পর সেটিও বিলীন হয়ে যেতে পারে, এমন আশঙ্কার মুহূর্তেই ছবিটি ধারণ করেন তিনি।
ঘটনাটি বর্ণনা করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন এই আলোকচিত্রী। তিনি জানান, শুধু ওই কবরটি নয়, পরবর্তী সময়ে সেখানকার পুরো কবরস্থানই সমুদ্রে বিলীন হয়ে গেছে। এমনকি ওই ঘাটের অস্তিত্বও এখন আর নেই।
ছবিটি দেখে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকুয়াকালচার বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী দেশগুলোর বোধোদয় হলে বাংলাদেশ হয়তো একসময় ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ তহবিল থেকে ক্ষতিপূরণ পেতে পারে। কিন্তু একজন মানুষের বাবার কবর হারিয়ে যাওয়ার ক্ষতির মূল্য কীভাবে নির্ধারণ করা হবে? কোটি টাকা পেলেও কি কেউ নিজের বাবার কবর হারানোর বিনিময়ে ক্ষতিপূরণ চাইবেন?
আতিকুল ইসলাম নামে এক দর্শনার্থী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মানুষ যে কত মূল্যবান সম্পদ হারাচ্ছে, তার সবকিছুর ক্ষতি অর্থ দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়। এই ছবিটি তারই একটি প্রমাণ। তাঁর মতে, ছবিটি বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরা উচিত, যাতে সবাই বুঝতে পারেন, জলবায়ু পরিবর্তনে মানুষ শুধু অর্থনৈতিক বা শারীরিকভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না; সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় দিক থেকেও অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়ছে।
‘Waves of Life’ শিরোনামের এ প্রদর্শনীর আয়োজন করে ইয়্যুথ ফর ওশান, ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশ এবং মিশন গ্রিন বাংলাদেশ। নদী, সমুদ্র, জলজ বাস্তুতন্ত্র, জীববৈচিত্র্য এবং উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকার নানা বাস্তবতা তুলে ধরাই ছিল এ আয়োজনের উদ্দেশ্য।
প্রতিযোগিতায় একুয়াটিক লাইভলিহুড ও কোস্টাল পলিউশন বিভাগে চ্যাম্পিয়ন হন ইমরান পারভেজ। মেরিন বায়োডাইভার্সিটি বিভাগে চ্যাম্পিয়ন হন সাঈদ আব্বাস এবং এনার্জি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট বিভাগে পুরস্কৃত হন রাজীব রাইহান। তিনটি বিভাগে রানারআপ হিসেবে পুরস্কার পান মোহাম্মদ আমদাদ হোসাইন, মোহাম্মদ তাহিদুল ইসলাম ও আয়মান নাকিব। এ ছাড়া বিশেষ স্বীকৃতি পান জাকির হোসাইন, গালীব রহমান নাদিম, মোহাম্মদ শাহজাহান ও আয়মান নাকিব।
পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ঢাকা জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ফরিদা খানম বলেন, বাংলাদেশ নদীমাতৃক ও সমুদ্রবেষ্টিত দেশ। বঙ্গোপসাগর, উপকূলীয় অঞ্চল, নদ-নদী ও জলাভূমি দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ। এগুলো পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি খাদ্যনিরাপত্তা, অর্থনীতি ও অসংখ্য মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। তবে প্লাস্টিক ও বর্জ্যদূষণ, অপরিকল্পিত সম্পদ আহরণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এসব প্রাকৃতিক সম্পদ ও প্রতিবেশ নানা সংকটে পড়েছে।
তিনি বলেন, পরিবেশ সংরক্ষণ শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্র, সমাজ ও প্রতিটি নাগরিকের সম্মিলিত দায়িত্ব। এ সংকট মোকাবিলায় সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ জরুরি।
আলোকচিত্রের গুরুত্ব তুলে ধরে ফরিদা খানম বলেন, অনেক সময় দীর্ঘ বক্তব্য যে বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে না, একটি ছবি মুহূর্তেই মানুষের হৃদয় ও বিবেককে নাড়া দিতে পারে। পরিবেশবিষয়ক আলোকচিত্র প্রকৃতির সৌন্দর্য, জীববৈচিত্র্য, মানুষের জীবনসংগ্রাম ও দূষণের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এ ক্ষেত্রে আলোকচিত্র ধারণ ও উপস্থাপনায় সত্যনিষ্ঠা, যথাযথ প্রেক্ষাপট এবং পেশাগত নৈতিকতা বজায় রাখা জরুরি।
ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশের সমন্বয়ক, ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)-এর সদস্য সচিব এবং ইয়্যুথ ফর ওশানের উপদেষ্টা শরীফ জামিলের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা ও পাখি বিশেষজ্ঞ ইনাম আল হক।
এ ছাড়া বক্তব্য দেন সার্ক কৃষি কেন্দ্রের সিনিয়র প্রোগ্রাম অফিসার আবুল বাশার মিরাজ, মেরিন জার্নালিস্ট নেটওয়ার্কের সেক্রেটারি ও মিশন গ্রিন বাংলাদেশের পরিচালক কেফায়েত শাকিল, জীববৈচিত্র্য বিশেষজ্ঞ আবু সাঈদ, মাকজিওন লিমিটেডের চেয়ারম্যান মাকসুদ হোসেন, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকুয়াকালচার বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলী, মেরিন আন্ডারওয়াটার এক্সপ্লোরার ও সেভ আওয়ার সি-এর পরিচালক সুফি মো. আতিকুর রহমান, আলোকচিত্রী সাঈদ আব্বাস ও আয়মান নাকিবসহ অনেকে।
বক্তারা বলেন, ‘Waves of Life’ কেবল একটি আলোকচিত্র প্রতিযোগিতা ও প্রদর্শনী নয়; বরং তরুণদের সৃজনশীল দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্ককে নতুনভাবে তুলে ধরা এবং পরিবেশ সংরক্ষণে সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোর একটি উদ্যোগ। এ ধরনের আয়োজন তরুণ প্রজন্মকে নদী, সমুদ্র ও জলজ জীববৈচিত্র্য রক্ষায় আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে উৎসাহিত করবে বলে তাঁরা আশা প্রকাশ করেন।
আয়োজকদের তথ্যমতে, দেশের দেড় শতাধিক আলোকচিত্রী তিনটি বিভাগে প্রায় ৬০০টি ছবি জমা দেন। সেখান থেকে বিচারকদের বিবেচনায় সেরা ১০৫টি ছবি প্রদর্শনীর জন্য নির্বাচিত হয়। প্রতিযোগিতার বিচারক ছিলেন আলোকচিত্রী ও আলোকচিত্র শিক্ষাবিদ আবির আবদুল্লাহ, জার্মানির হামবোল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত সমুদ্রবিষয়ক বিশেষজ্ঞ মফিজ রহমান এবং ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)-এর সদস্য ও রিভার বাংলার সম্পাদক ফয়সাল আহমেদ।
সমুদ্রের ভাঙনে বাবার কবর হারিয়ে যাওয়ার আগে শেষবারের মতো জিয়ারতের সেই দৃশ্য তাই কেবল একটি আলোকচিত্র হয়ে থাকেনি। ছবিটি হয়ে উঠেছে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মানুষের হারিয়ে ফেলা স্মৃতি, আবেগ ও ঐতিহ্যের এক মর্মস্পর্শী দলিল, যে ক্ষতির কোনো আর্থিক মূল্য নির্ধারণ করা যায় না।
আরু|



