দেশের কারাগারগুলোতে যেন তিল ধারণেরও জায়গা নেই। ধারণক্ষমতার দ্বিগুণেরও বেশি বন্দি নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে কারা কর্তৃপক্ষ। সাম্প্রতিক সময়ে বন্দির সংখ্যা এক লাখের ঘর ছাড়িয়েছে, অথচ দেশের কারাগারগুলোর মোট ধারণক্ষমতা প্রায় ৪৫ হাজার ১৮৬ জন। অর্থাৎ ধারণক্ষমতার তুলনায় বন্দি রয়েছে প্রায় আড়াই গুণ।
কিছু কারাগারে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। কোথাও ধারণক্ষমতার পাঁচ গুণ, কোথাও ছয় গুণ, আবার কোথাও সাত গুণেরও বেশি বন্দি রাখা হয়েছে। ফলে আবাসন, চিকিৎসা, খাবার ও নিরাপত্তা সব ক্ষেত্রেই তৈরি হচ্ছে বাড়তি চাপ।
পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ বন্দি
কারা অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, চলতি সেপ্টেম্বরেই দেশের কারাগারগুলোতে বন্দির সংখ্যা এক লাখের বেশি হয়েছে। ১৫ সেপ্টেম্বরের তথ্য অনুযায়ী, ৭৬টি কারাগারে বন্দি ছিল ১ লাখ ৪ হাজার ৬১৭ জন। একই সময়ে কারাগারগুলোর মোট অনুমোদিত ধারণক্ষমতা ৪৫ হাজার ১৮৬ জন।
গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যানেও দেখা যায়, বন্দির সংখ্যা কখনোই এতটা বাড়েনি। ২০২১ সালে সর্বোচ্চ বন্দির সংখ্যা ছিল প্রায় ৯০ হাজার। ২০২২ সালে তা কমে আসে, ২০২৩ ও ২০২৪ সালেও ছিল তুলনামূলক কম। ২০২৫ সালের শেষ দিকে বন্দির সংখ্যা ছিল ৮৩ হাজারের কিছু বেশি। কিন্তু ২০২৬ সালে এসে সেই সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়ে গেছে।
অর্থাৎ, অল্প সময়ের মধ্যেই কারাগারগুলোর ওপর তৈরি হয়েছে বড় ধরনের চাপ।
কোন কারাগারে সবচেয়ে বেশি চাপ?
সার্বিক চিত্রের চেয়েও ভয়াবহ কিছু জেলা কারাগারের অবস্থা।
শেরপুর জেলা কারাগারের ধারণক্ষমতা মাত্র ১০০ জন। কিন্তু সেখানে বন্দির সংখ্যা ৭৪৬ জন অর্থাৎ ধারণক্ষমতার প্রায় সাড়ে সাত গুণ।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা কারাগারে ১৫৩ জনের জায়গায় বন্দি রয়েছে ৯৩৬ জন। ভোলা জেলা কারাগারে ১০০ জনের ধারণক্ষমতার বিপরীতে বন্দি ৬৬৮ জন।
এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ, ঝিনাইদহ, রাজবাড়ী ও চাঁদপুরের মতো কয়েকটি কারাগারেও ধারণক্ষমতার প্রায় পাঁচ গুণ পর্যন্ত বন্দি রয়েছে। অন্যদিকে কাশিমপুর-৩ মহিলা কারাগারসহ আরও কয়েকটি কারাগারে ধারণক্ষমতার চার গুণের বেশি বন্দি থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।
অর্থাৎ, যে কারাগারে থাকার কথা কয়েকশ মানুষ, সেখানে এখন কয়েক হাজার বন্দিকে সামলাতে হচ্ছে।
হঠাৎ এত বন্দি বাড়ল কেন?
বন্দির সংখ্যা বাড়ার পেছনে কয়েকটি কারণ সামনে এসেছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দেশজুড়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়মিত ও বিশেষ অভিযান। বিভিন্ন সময়ে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, মাদক, অবৈধ অস্ত্র, জুয়া ও কিশোর গ্যাংসহ বিভিন্ন অপরাধের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ মে থেকে ২৬ আগস্ট পর্যন্ত বিশেষ অভিযানে ৫৩ হাজার ৫১৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একই সময়ে অন্যান্য মামলা ও অভিযানে গ্রেপ্তার করা হয়েছে আরও ১ লাখ ৪১ হাজার ৬২৮ জন। সব মিলিয়ে ১ লাখ ৯৫ হাজার ১৪৬ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন।
পুলিশের অভিযানে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও মাদকও উদ্ধার হয়েছে। বিশেষ অভিযানে ৪৩৮টি আগ্নেয়াস্ত্র, ৪ হাজার ৭২২ রাউন্ড গুলি ও কার্তুজ এবং বিপুল পরিমাণ দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। মাদকবিরোধী অভিযানে ইয়াবা, হেরোইন, ফেনসিডিল ও গাঁজাসহ বিভিন্ন মাদক উদ্ধারের তথ্যও দিয়েছে পুলিশ।
মাদক মামলাও বড় কারণ
কারাগারে বন্দি বাড়ার পেছনে মাদক মামলার আসামিদের সংখ্যাও বড় ভূমিকা রাখছে।
দ্য ডেইলি স্টারের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে কারা তথ্যের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, প্রায় ১৮ হাজার ৭৭১ জন বন্দি মাদক-সংক্রান্ত মামলায় আটক ছিলেন। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশেষ অভিযান ও অন্যান্য কারণে গ্রেপ্তার বাড়ার পাশাপাশি মামলার বিচার দীর্ঘায়িত হওয়াও কারাগারে অতিরিক্ত চাপের একটি কারণ।
এদিকে, কারাগারের মোট বন্দিদের বড় একটি অংশ এখনো বিচারাধীন। সেপ্টেম্বরের তথ্য অনুযায়ী, বন্দিদের প্রায় ৬৬ দশমিক ৯ শতাংশই বিচারাধীন বা রিমান্ডে থাকা বন্দি।
শুধু জায়গার সংকট নয়, বাড়ছে অন্য চাপও
একসঙ্গে এত বেশি বন্দি রাখার ফলে শুধু ঘুমানোর জায়গার সংকটই নয়, চিকিৎসা, খাবার, স্যানিটেশন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।
কারাগারগুলোর ধারণক্ষমতা ৪৫ হাজার ১৮৬ জন হলেও সাম্প্রতিক সময়ে বন্দির সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়েছে। ফলে গড়ে প্রতিটি কারাগারেই ধারণক্ষমতার দ্বিগুণের বেশি বন্দি থাকার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
কারা কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অভিযান বাড়লে গ্রেপ্তারও বাড়ে। আদালতের মাধ্যমে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের একটি অংশ কারাগারে যাওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই বন্দির সংখ্যা বেড়ে যায়।
সামনে বড় প্রশ্ন
কারাগারে বন্দি বাড়ার পেছনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় অভিযান, মাদকবিরোধী কার্যক্রম, বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার এবং বিচারাধীন মামলার দীর্ঘসূত্রতাসহ একাধিক কারণ কাজ করছে।
তবে প্রশ্ন হলো- ৪৫ হাজারের কিছু বেশি ধারণক্ষমতার কারাগারে যখন এক লাখেরও বেশি মানুষকে রাখতে হচ্ছে, তখন এই চাপ কতদিন সামাল দেওয়া সম্ভব?
অপরাধ দমন যেমন জরুরি, তেমনি কারাগারে বন্দিদের জন্য পর্যাপ্ত আবাসন, চিকিৎসা, নিরাপত্তা ও মানবিক পরিবেশ নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
নতুন অবকাঠামো, দ্রুত বিচার, জামিনযোগ্য মামলায় অপ্রয়োজনীয় আটক কমানো এবং পুনর্বাসন ব্যবস্থার মতো বিষয়গুলো কার্যকরভাবে সমাধান করা না গেলে কারাগারের এই অতিরিক্ত চাপ আরও বড় সংকটে রূপ নিতে পারে।
আরু|



