এতদিন দেশের গ্রাম ও মফস্বল এলাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের খবর পাওয়া গেলেও এবার সেই চিত্র দেখা যাচ্ছে খোদ রাজধানী ঢাকায়।
বুধবার (১২ আগস্ট) রাত থেকে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন নগরবাসী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একের পর এক পোস্ট ও মন্তব্যে ফুটে উঠেছে নাগরিকদের ক্ষোভ ও দুর্ভোগের চিত্র।
ফারিন আহমেদ নামে এক ব্যবহারকারী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘গ্রাম ছেড়ে লোডশেডিং এখন ঢাকায়।’ রাজধানীর সাম্প্রতিক বিদ্যুৎ পরিস্থিতির চিত্র যেন এই মন্তব্যেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
বিদ্যুৎ বিভ্রাটের ভোগান্তি তুলে ধরে সাংবাদিক আতাউর রহমান তার ফেসবুক ওয়ালে লিখেছেন, ‘সকালে বেরিয়ে সারাদিন দৌড়ঝাঁপ দিয়ে রাত সোয়া ১১টায় আমি যখন বাসায় আসলাম, তিনি (বিদ্যুৎ) তখন চলে গেলেন।’ দীর্ঘ কর্মব্যস্ততার পর ঘরে ফিরে স্বস্তির বদলে লোডশেডিংয়ের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে নগরবাসীকে।
দেশজুড়ে বাড়ছে বিদ্যুৎ ঘাটতি
সাম্প্রতিক সময়ে দেশে লোডশেডিং আবারও তীব্র আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের অনেক এলাকায় কয়েক ঘণ্টা করে বিদ্যুৎ থাকছে না। বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস ও অন্যান্য জ্বালানির সংকট, এলএনজি সরবরাহে সমস্যা এবং কয়লা সরবরাহের ঘাটতিকে বর্তমান পরিস্থিতির অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক হিসাবে, ৯ আগস্ট দেশের বিদ্যুৎ ঘাটতি একপর্যায়ে ৩ হাজার ৬৭১ মেগাওয়াটে পৌঁছেছিল। একই সময়ে রাত ১টায় ঘাটতি ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াটে ওঠে। ১২ আগস্ট রাত ১টায় জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ ঘাটতি ছিল ৩ হাজার ১৯৪ মেগাওয়াট এবং সকাল ৮টায়ও ঘাটতি ছিল ২ হাজার ৩১৪ মেগাওয়াট।
মঙ্গলবার দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ চাহিদা ছিল ১৮ হাজার ৯৭৫ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সরবরাহ করা হয় ১৫ হাজার ৮৩৩ মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি ছিল ৩ হাজার ১৪২ মেগাওয়াট। বুধবার রাত ৮টা পর্যন্তও লোডশেডিং ছিল প্রায় ৩ হাজার ১৪৬ মেগাওয়াট।
দেশে বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট হলেও জ্বালানি সংকটের কারণে সেই সক্ষমতার পুরোটা কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
অতীতের রেকর্ডও ছাড়িয়েছে লোডশেডিং
সাম্প্রতিক লোডশেডিংয়ের তীব্রতা আগের কয়েক বছরের রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে গেছে। ২০২৩ সালের ২৭ জুন সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয়েছিল ৩ হাজার ৪১৯ মেগাওয়াট। কিন্তু গত রোববার বিকেল ৩টায় লোডশেডিং বেড়ে ৩ হাজার ৬৭১ মেগাওয়াটে পৌঁছায়। একই দিন রাত ১টায় তা আরও বেড়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াটে। এর আগে ৩ আগস্ট রাত ১টায় সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল ৩ হাজার ৫১২ মেগাওয়াট।
গ্যাস সংকটেই মূল সমস্যা
বর্তমান বিদ্যুৎ সংকটের পেছনে বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে জ্বালানি সংকট। গত ২১ জুলাই কক্সবাজারের মহেশখালীতে অবস্থিত এক্সিলারেটর এনার্জির এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এর পর জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়। প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুটের সমপরিমাণ গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনেও এর সরাসরি প্রভাব পড়ে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সামিটের এলএনজি টার্মিনালে বৈরী আবহাওয়ার কারণে গ্যাস খালাসে সমস্যা এবং এক্সিলারেটর টার্মিনাল পূর্ণ সক্ষমতায় চালাতে না পারার বিষয়টি।
বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানিয়েছেন, টার্মিনালসংক্রান্ত সমস্যার কারণে পরিস্থিতি জটিল হয়েছে। সংকট মোকাবিলায় সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে এবং পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতির আশা করা হচ্ছে।
কমছে দেশীয় গ্যাস উৎপাদনও
শুধু আমদানিকৃত এলএনজির ওপর চাপ নয়, দেশের নিজস্ব প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদনও কমে যাচ্ছে। দেশে থাকা ২২টি প্রাকৃতিক গ্যাসকূপের সম্মিলিত উৎপাদন সক্ষমতা ১ হাজার ৬১৫ মিলিয়ন ঘনফুট। বর্তমানে রাষ্ট্রায়ত্ত এসব কূপ থেকে দৈনিক প্রায় ৯০০ থেকে ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন করা হয়। চাহিদার বাকি অংশ আমদানি করা এলএনজি দিয়ে পূরণ করা হয়।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে প্রায় ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন ও সরবরাহ করা হচ্ছে। দেশের সবচেয়ে বড় গ্যাসক্ষেত্র বিবিয়ানা থেকে গত বছর যেখানে ৯১৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন হয়েছিল, এ বছর তা কমে ৭৩৮ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমেছে। জালালাবাদ গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদনও ১৩০ মিলিয়ন ঘনফুট থেকে কমে ১২৩ মিলিয়ন ঘনফুট হয়েছে।
জ্বালানি সংকটে বন্ধ ২১ বিদ্যুৎকেন্দ্র
দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর প্রায় ৮৮ শতাংশই তেল, গ্যাস ও কয়লানির্ভর। বর্তমানে জ্বালানি সংকটে ২১টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যে ১৬টি গ্যাসভিত্তিক এবং পাঁচটি তেলভিত্তিক কেন্দ্র।
এ ছাড়া আরও ৩৪টি বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন কমে গেছে। এর মধ্যে আটটি গ্যাসভিত্তিক, ২৬টি তেলভিত্তিক এবং একটি কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র রয়েছে।
দেশের আটটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সম্মিলিত উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৭ হাজার ৩ মেগাওয়াট। বড়পুকুরিয়া ছাড়া অধিকাংশ কেন্দ্রের কয়লা আমদানিনির্ভর। কয়লা সরবরাহে ঘাটতির কারণে পটুয়াখালীর ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট কেন্দ্র বর্তমানে প্রায় ৮০০ থেকে ১ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন করছে। ১ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার আদানি কেন্দ্রও কয়লা সরবরাহের সীমাবদ্ধতায় প্রায় ১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে। তবে আদানি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শিগগিরই কয়লা সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার আশা রয়েছে।
পল্লী বিদ্যুতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি
দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ গ্রামাঞ্চলের প্রায় চার কোটি গ্রাহককে বিদ্যুৎ সেবা দেয় পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড। সংস্থাটির আওতাধীন প্রায় সব অঞ্চলেই লোডশেডিং বেড়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, পল্লী বিদ্যুতের ঢাকা অঞ্চলে ৩ হাজার ৪ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ২ হাজার ১৫৯ মেগাওয়াট। অর্থাৎ ঘাটতি ৮৪৫ মেগাওয়াট বা প্রায় ২৮ শতাংশ।
চট্টগ্রামে ৪২১ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ৩৪৭ মেগাওয়াট, খুলনায় ১ হাজার ১৫৩ মেগাওয়াটের বিপরীতে ৮৭৯, রাজশাহীতে ১ হাজার ৩৩ মেগাওয়াটের বিপরীতে ৭৫৬, কুমিল্লায় ১ হাজার ৯৬ মেগাওয়াটের বিপরীতে ৮৬৬, ময়মনসিংহে ১ হাজার ৭২ মেগাওয়াটের বিপরীতে ৭৩৮, সিলেটে ৪৪১ মেগাওয়াটের বিপরীতে ৩৩৪, বরিশালে ৩০২ মেগাওয়াটের বিপরীতে ২২৯ এবং রংপুরে ৬৫১ মেগাওয়াটের বিপরীতে ৪৭৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়েছে।
অর্থাৎ ঢাকা অঞ্চলে ঘাটতি প্রায় ২৮ শতাংশ, চট্টগ্রামে ১৮, খুলনায় ২৪, রাজশাহীতে ২৭, কুমিল্লায় ২১, ময়মনসিংহে ৩১, সিলেটে ২৪, বরিশালে ২৪ এবং রংপুরে ২৭ শতাংশ। পল্লী বিদ্যুতের আওতায় সার্বিক গড় ঘাটতি প্রায় ২৫ শতাংশ।
রংপুরে ঘণ্টায় ঘণ্টায় বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া
রংপুরে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১ হাজার ১৫০ মেগাওয়াট। বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে ৭০০ মেগাওয়াটের কিছু বেশি। প্রায় ৪৫০ মেগাওয়াট ঘাটতির কারণে নগর ও গ্রামাঞ্চলে ঘণ্টায় ঘণ্টায় লোডশেডিং হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, একবার বিদ্যুৎ চলে গেলে প্রায় এক ঘণ্টা পর ফিরছে, আবার কিছুক্ষণ পরই চলে যাচ্ছে। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষ সবচেয়ে বেশি কষ্টে পড়েছেন।
হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোও জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছে। এতে পরিচালন ব্যয় বাড়ছে এবং সেবার ওপরও চাপ তৈরি হচ্ছে।
সিলেটে দিনে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎহীনতা
সিলেট বিভাগেও একই ধরনের সংকট দেখা দিয়েছে। নগর থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত দফায় দফায় বিদ্যুৎ বিভ্রাটে মানুষ অতিষ্ঠ। কোনো কোনো এলাকায় দিনে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টার বেশি সময় বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগও রয়েছে।
লোডশেডিংয়ের প্রতিবাদে সিলেট সদর উপজেলার খাদিমপাড়া ও নগরীর টুকেরবাজার এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দারা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন।
পিডিবির তথ্য অনুযায়ী, সিলেটে ২৫২ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ২০৭ মেগাওয়াট। ঘাটতি ৪৫ মেগাওয়াট। ব্যবসায়ীরাও বলছেন, ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে জেনারেটর চালাতে হচ্ছে, এতে ব্যবসার পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।
বরিশালে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ
বরিশালে দৈনিক ১১০ থেকে ১২০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ৫০ মেগাওয়াট। ফলে এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহের পর পরের ঘণ্টাতেই তা বন্ধ রাখতে হচ্ছে। অনেক এলাকায় দিনে ১২ ঘণ্টার বেশি লোডশেডিং হচ্ছে।
বিদ্যুৎনির্ভর ব্যবসায়ীরা বলছেন, ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় কাজ সময়মতো শেষ করা যাচ্ছে না। শিল্পকারখানাগুলোকে জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচ বাড়ার পাশাপাশি উৎপাদনও কমে যাচ্ছে।
চট্টগ্রামেও দিনে ৬ থেকে ৮ বার লোডশেডিং
চট্টগ্রাম নগরীর অনেক এলাকায় দিনে ছয় থেকে আটবার পর্যন্ত বিদ্যুৎ যাচ্ছে। একবার বিদ্যুৎ চলে গেলে ফিরতে আধা ঘণ্টা থেকে দেড় ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লাগছে। কোনো কোনো এলাকায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আট থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগও রয়েছে।
পিডিবির তথ্য অনুযায়ী, সোমবার সন্ধ্যায় চট্টগ্রামে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১ হাজার ২৫০ মেগাওয়াট। জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ পাওয়া যায় ৯৫০ মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি দাঁড়ায় প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট।
চট্টগ্রাম অঞ্চলে ২৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের সম্মিলিত উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৪ হাজার ৮৯৮ মেগাওয়াট হলেও জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ ঘাটতির কারণে গ্রাহক পর্যায়ে এর সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।
কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকাতেও দিনে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিভ্রাটের অভিযোগ রয়েছে। এতে পর্যটন, মৎস্য ও বরফকলসহ বিভিন্ন ব্যবসা ক্ষতির মুখে পড়েছে।
ময়মনসিংহে ১০ থেকে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ নেই
ময়মনসিংহ বিভাগের ময়মনসিংহ, জামালপুর, শেরপুর ও নেত্রকোনায়ও লোডশেডিং ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, কোনো কোনো এলাকায় ১০ থেকে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না।
ময়মনসিংহ জোনে সন্ধ্যার সময় বিদ্যুতের চাহিদা ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩৫০ মেগাওয়াট থাকলেও সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ১ হাজার ৯১ থেকে ১ হাজার ১০০ মেগাওয়াট।
নেত্রকোনার ১০ উপজেলায় চাহিদা ১৫৯ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৬৬ মেগাওয়াট। ফলে অনেক এলাকায় ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। জামালপুরের বিভিন্ন গ্রামে ১২ থেকে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ রয়েছে। শেরপুরেও ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে জনদুর্ভোগ বেড়েছে।
রাজশাহী বিভাগেও তীব্র সংকট
রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন এলাকায়ও বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব পড়েছে। নেসকোর তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার দুপুরে বিভাগের মোট চাহিদা ছিল ৫১৬ দশমিক ৫ মেগাওয়াট। বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যায় ৪৩২ দশমিক ৮ মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি ছিল ৮৩ দশমিক ৭ মেগাওয়াট বা প্রায় ১৬ শতাংশ।
রাজশাহী, পাবনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নাটোরের বিভিন্ন এলাকায় ঘন ঘন লোডশেডিং হচ্ছে। পাবনায় দিনে ছয় থেকে সাতবার পর্যন্ত বিদ্যুৎ যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের কিছু এলাকায় ২৪ ঘণ্টায় মাত্র পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়ার কথা জানিয়েছেন গ্রাহকরা। নাটোরের গুরুদাসপুরের কয়েকটি এলাকায় ১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বাড়তি দামে বিদ্যুৎ, তবুও কাটছে না ভোগান্তি
গ্রাহক পর্যায়ে গত জুনে বিদ্যুতের দাম ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু দাম বাড়ার পরও বিদ্যুৎ সরবরাহের সংকট কাটেনি। বর্ষা মৌসুমের শেষ দিকে ভ্যাপসা গরমের মধ্যে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় জনজীবনে নেমে এসেছে চরম দুর্ভোগ।
সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষ। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ক্ষুদ্র ব্যবসা, শিল্পকারখানা, হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টারসহ বিদ্যুৎনির্ভর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। জেনারেটর চালাতে গিয়ে বাড়ছে জ্বালানি ও পরিচালন ব্যয়।
দ্রুত সমাধানের আশ্বাস
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানিয়েছেন, মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালের সমস্যার কারণে গ্যাস সরবরাহ কমেছে এবং এর প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। সংকট সমাধানে কাজ চলছে এবং কয়েক দিনের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার আশা করা হচ্ছে।
পিডিবির সদস্য (উৎপাদন) জহুরুল ইসলামও জানিয়েছেন, গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। তবে লোডশেডিং সহনীয় পর্যায়ে রাখতে উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ইজাজ হোসেইনের মতে, বর্তমান লোডশেডিংয়ের মূল কারণ জ্বালানি সংকট। স্বল্প সময়ে এই সংকট পুরোপুরি কাটানো কঠিন। এলএনজি আমদানি বাড়িয়ে সাময়িকভাবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে জোর দেওয়ার বিকল্প নেই।
সব মিলিয়ে, বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকার পরও জ্বালানি সংকট, গ্যাস সরবরাহের ঘাটতি এবং কয়লা সরবরাহের সমস্যায় দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা বড় ধরনের চাপের মধ্যে পড়েছে। এতদিন গ্রামাঞ্চলের পরিচিত দুর্ভোগ হিসেবে দেখা লোডশেডিং এখন রাজধানীসহ শহরাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ায়
পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়ছে। দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে এই সংকট আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আরু|খব



