আজ ৩০ আগস্ট, আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস। বিশ্বজুড়ে গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের দুর্ভোগ, সত্য জানার অধিকার এবং ন্যায়বিচারের দাবিকে সামনে রেখে প্রতি বছর দিবসটি পালিত হয়। এবারের প্রতিপাদ্য_‘ভিক্টিমস ফার্স্ট, অ্যাকশন্স নাউ’ বা ‘ভুক্তভোগীরাই প্রথম, এখনই পদক্ষেপ’।
গুম এমন এক মানবাধিকার লঙ্ঘন, যার যন্ত্রণা শুধু নিখোঁজ ব্যক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; দীর্ঘদিন অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকা পরিবার ও পুরো সমাজও এর শিকার হয়। জাতিসংঘের মতে, জোরপূর্বক গুমের ক্ষেত্রে কাউকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে আটক বা অপহরণ করার পর তার অবস্থান বা পরিণতি জানাতে অস্বীকৃতি জানানো হয়। এতে ভুক্তভোগী আইনের সুরক্ষা থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন।
একজন মানুষ মারা গেলে তার পরিবার অন্তত মৃত্যুর সত্যটি জানতে পারে, শেষ বিদায় জানাতে পারে। কিন্তু গুমের ঘটনায় সেই সুযোগটুকুও অনেক সময় থাকে না। স্বজনরা বছরের পর বছর অপেক্ষা করেন_প্রিয় মানুষটি বেঁচে আছেন কি না, কোথায় আছেন, কিংবা তার কী পরিণতি হয়েছে_এই প্রশ্নের উত্তর না পেয়েই।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ২০১০ সালের ২১ ডিসেম্বর ৩০ আগস্টকে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। ২০১১ সাল থেকে বিশ্বজুড়ে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। ২০০৬ সালের ২০ ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ‘ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন ফর দ্য প্রটেকশন অব অল পারসন্স ফ্রম এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স’ গ্রহণ করেছিল।
বাংলাদেশেও গত দেড় দশকে গুমের অভিযোগ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন ও বিভিন্ন প্রতিবেদনে বিরোধী রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, অধিকারকর্মী ও সাংবাদিকসহ বহু মানুষের নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ উঠে এসেছে।
বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলী ও চৌধুরী আলমসহ কয়েকজনের নিখোঁজের ঘটনা দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত। তাদের পরিবারের সদস্যরা এখনও প্রিয়জনের সন্ধানের অপেক্ষায় রয়েছেন।
জাতিসংঘ ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার তথ্যের পাশাপাশি বাংলাদেশে গঠিত গুম তদন্ত কমিশনের অনুসন্ধানেও গত সরকারের আমলে গুমের অভিযোগ নিয়ে বিস্তারিত তথ্য উঠে এসেছে। এসব ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও তদন্ত করা হয়েছে।
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর গুমের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। গুমের অভিযোগ তদন্তে কমিশন গঠন করা হয় এবং ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
গুম প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ ছিল ‘ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন ফর দ্য প্রটেকশন অব অল পারসন্স ফ্রম এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স’-এ যোগ দেওয়া।
২০২৪ সালের ২৯ আগস্ট বাংলাদেশ ওই সনদে যোগদানের দলিলে স্বাক্ষর করে। জাতিসংঘের নথি অনুযায়ী, ৩০ আগস্ট ২০২৪ বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে এতে যোগ দেয় এবং ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৪ থেকে সনদটি বাংলাদেশের জন্য কার্যকর হয়।
বর্তমান সরকার গুমের ঘটনাগুলোর তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার কথা জানিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে দেওয়া বাণীতে গুমকে মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করে বলেছেন, প্রতিটি ঘটনা তদন্ত করে বিচার কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ বন্ধে পৃথক আইনি কাঠামো তৈরির কথাও জানিয়েছেন তিনি।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ‘Prevention and Remedy of Enforced Disappearance Bill, 2026’ এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন-সংক্রান্ত দুটি বিল সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে। গুমকে আলাদা অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধ এবং ভুক্তভোগীদের প্রতিকার নিশ্চিত করাই এসব উদ্যোগের লক্ষ্য।
আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী গত এপ্রিলে সংসদে জানিয়েছিলেন, আগের সরকারের সময়ে সংঘটিত হত্যা, গুম ও নির্যাতনের ঘটনায় সারাদেশে ১ হাজার ৮৫৫টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ৭৯৯টি হত্যা মামলা এবং ১ হাজার ৫৬টি অন্যান্য অভিযোগে করা মামলা। ১৫৮টি মামলার তদন্ত শেষ করে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে এবং বাকি মামলাগুলোর তদন্ত চলছে বলে তিনি জানান।
জাতিসংঘ বলছে, গুম কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা অঞ্চলের সমস্যা নয়। বিশ্বের অন্তত ৮৫টি দেশে সংঘাত বা দমন-পীড়নের সময় লাখো মানুষ নিখোঁজ হয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিরোধীদের দমন, ভয় সৃষ্টি এবং ভিন্নমত নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসেবেও গুম ব্যবহৃত হয়েছে।
২০২৬ সাল গুম প্রতিরোধবিষয়ক আন্তর্জাতিক সনদ গ্রহণের ২০ বছর পূর্তির বছর। এ বছর জাতিসংঘ ভুক্তভোগীদের সত্য, ন্যায়বিচার ও ক্ষতিপূরণের অধিকারকে সামনে রেখে বিশ্বজুড়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
আজকের দিনটি তাই শুধু নিখোঁজ মানুষদের স্মরণ করার দিন নয়; বরং তাদের সন্ধান, সত্য উদঘাটন, পরিবারের অধিকার নিশ্চিত করা এবং গুমের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের বিরুদ্ধে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠারও দিন।
গুমের প্রতিটি ঘটনার সত্য বেরিয়ে আসুক_স্বজনরা ফিরে পান তাদের অপেক্ষার উত্তর, আর কোনো পরিবারকে যেন প্রিয়জনের ভাগ্য জানতে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে না হয়।
আরু|



