২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের ইতিহাসে ৩০ জুলাই ছিল অন্যতম প্রতীকী একটি দিন। রাষ্ট্রীয় শোক পালনের সরকারি ঘোষণার বিপরীতে সেদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে লাল রঙের প্রোফাইল ছবির ঢল। মুখ ও চোখে লাল কাপড় বেঁধে ছবি প্রকাশ করে হাজারো শিক্ষার্থী ও নাগরিক প্রতিবাদের নতুন ভাষা তৈরি করেন।
সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে সংঘর্ষে নিহতদের স্মরণে সরকার ৩০ জুলাই এক দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছিল। এ উপলক্ষে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কালো ব্যাজ ধারণ করেন এবং দেশের মসজিদ, মন্দির, গির্জা ও প্যাগোডায় বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হয়।
তবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বানে আন্দোলনকারীরা রাষ্ট্রীয় শোক প্রত্যাখ্যান করে লাল রঙকে প্রতিবাদ, প্রতিরোধ ও ন্যায়বিচারের দাবির প্রতীক হিসেবে বেছে নেন। পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী মুখ ও চোখে লাল কাপড় বেঁধে ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করা হয়। আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক মাহিন সরকারের আহ্বানে শুরু হওয়া এই কর্মসূচিতে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, সাংবাদিক, লেখক, শিল্পী, সংস্কৃতিকর্মী, বিভিন্ন অঙ্গনের তারকা এবং সাধারণ মানুষ ব্যাপকভাবে অংশ নেন। অন্যদিকে, সরকার সমর্থকদের একটি অংশ রাষ্ট্রীয় শোকের প্রতি সমর্থন জানিয়ে কালো রঙের প্রোফাইল ছবি ব্যবহার করেন।
রাজপথেও ছিল প্রতিবাদ
অনলাইন কর্মসূচির পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালিত হয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা মুখে লাল কাপড় বেঁধে মৌন মিছিল করেন। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন করেন। রাজধানীর গুলিস্তানে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন প্রতিবাদী গানের মিছিল বের করে, যেখানে ছাত্র-জনতার হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন ও গণগ্রেপ্তারের প্রতিবাদ জানানো হয়। এ সময় পুলিশের সঙ্গে বাকবিতণ্ডা ও ধাক্কাধাক্কির ঘটনাও ঘটে।
‘মার্চ ফর জাস্টিস’ কর্মসূচির ঘোষণা
৩০ জুলাই রাতেই আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আব্দুল কাদের টেলিগ্রামের মাধ্যমে পরদিন ৩১ জুলাই দেশব্যাপী ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ কর্মসূচির ঘোষণা দেন। এতে আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও রাজপথে সমাবেশের আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে শিক্ষক, আইনজীবী, মানবাধিকারকর্মী, পেশাজীবী, শ্রমজীবী ও সাধারণ নাগরিকদের আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি প্রকাশের আহ্বান জানানো হয়। ঘোষণায় জাতিসংঘের মাধ্যমে তদন্ত, গণগ্রেপ্তার ও সহিংসতার প্রতিবাদ এবং শিক্ষার্থীদের ৯ দফা দাবি বাস্তবায়নের বিষয়টি তুলে ধরা হয়।
বিশিষ্ট নাগরিকদের ১১ দফা দাবি
ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে অনুষ্ঠিত এক সমাবেশে বিশিষ্ট নাগরিকরা ডিবি হেফাজতে থাকা ছয় সমন্বয়কের নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানান। পাশাপাশি জাতিসংঘের জ্যেষ্ঠ বিশেষজ্ঞের নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক মানের স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠনসহ ১১ দফা দাবি উত্থাপন করা হয়। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আটক সমন্বয়কদের মুক্তি না দিলে আরও কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়।
সরকারের অবস্থান
একদিকে আন্দোলন চলতে থাকলেও সরকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ধাপে ধাপে খুলে দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানায়। তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী বলেন, নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় পর্যায়ক্রমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালু করা হবে এবং প্রয়োজন হলে অনলাইন ক্লাসও চালুর বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
এ সময় সরকার জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরকে নিষিদ্ধ করার প্রক্রিয়াও এগিয়ে নেওয়ার কথা জানায়। সরকারের একাধিক মন্ত্রী পরদিনের মধ্যেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হওয়ার ইঙ্গিত দেন। অন্যদিকে, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অভিযোগ করেন, গণহত্যার অভিযোগ থেকে দৃষ্টি সরাতেই সরকার এ বিষয়টি সামনে আনছে।
আন্তর্জাতিক উদ্বেগ
৩০ জুলাই বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলেও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিশ্বাসযোগ্য তথ্যের বিষয়ে উদ্বেগ জানান। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান জোসেপ বোরেলও আইনবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। একই সময়ে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিব অ্যাগনেস ক্যালামার্ড তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্দেশ্যে খোলা চিঠিতে নিরপেক্ষ তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
অন্যদিকে, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও সংঘাত-সহিংসতার নিরপেক্ষ তদন্তে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সহযোগিতা চেয়ে দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।
মামলা ও গ্রেপ্তার
৩০ জুলাই পর্যন্ত রাজধানী ঢাকায় সংঘর্ষ-সহিংসতার ঘটনায় ২৬৪টি মামলা দায়ের করা হয়, যার মধ্যে ৫৩টি ছিল হত্যা মামলা। ঢাকা মহানগরে প্রায় ২ হাজার ৮৫০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, সারা দেশে গ্রেপ্তারের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যায়। একই সময়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ছয় সমন্বয়ক কয়েক দিন ধরে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হেফাজতে ছিলেন।
৩০ জুলাই ২০২৪ তাই শুধু রাষ্ট্রীয় শোক পালনের দিনই নয়, বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাল প্রোফাইল ছবি এবং রাজপথের কর্মসূচির মাধ্যমে প্রতিবাদ ও সংহতির এক স্মরণীয় দিন হিসেবেও বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে।
আরু/


