ইতিহাস কখনও সরলরৈখিক নয়। ইতিহাসের ভেতরে কিছু মুহূর্ত থাকে, যেগুলো প্রথম দেখায় সাধারণ সিদ্ধান্ত মনে হলেও সময়ের প্রবাহে সেগুলোই হয়ে ওঠে রাষ্ট্র, রাজনীতি ও ক্ষমতার ভবিষ্যৎ নির্মাণের বাঁকবদল। বহু বছর পর পেছনে তাকালে মনে হয়—একটি সিদ্ধান্ত, একটি পরামর্শ কিংবা একটি সম্পর্ক হয়তো বদলে দিতে পারত পুরো একটি দেশের রাজনৈতিক ভাগ্যরেখা।
তোফায়েল আহমেদ আজ আর আমাদের মাঝে নেই। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের পর তাঁর বিদায় আমাদের সামনে শুধু একজন প্রথিতযশা রাজনীতিবিদের জীবনকেই নয়, বরং ইতিহাসের কিছু অমীমাংসিত প্রশ্নও নতুনভাবে হাজির করে। বিশেষত ১৯৭৫ সালের প্রাক্-পরিস্থিতি, বঙ্গবন্ধুর আশপাশের রাজনৈতিক বলয়, সামরিক অস্থিরতা এবং জিয়াউর রহমানকে ঘিরে গড়ে ওঠা ঘটনাপ্রবাহ নতুন করে আলোচনার দাবি রাখে।
লে. কর্নেল (অব.) এম. এ. হামিদের স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থ ‘তিনটি সেনা অভ্যুত্থান ও কিছু না বলা কথা’-এ এমন একটি বর্ণনা পাওয়া যায়, যেখানে বলা হয়েছে যে জিয়াউর রহমানকে পূর্ব জার্মানিতে রাষ্ট্রদূত হিসেবে পাঠানোর একটি সিদ্ধান্ত প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল।
তৎকালীন রাজনৈতিক ও সামরিক মহলে ধারণা ছিল:
- বঙ্গবন্ধু এবং আওয়ামী লীগের একটি অংশ জিয়াউর রহমানকে উচ্চাকাঙ্ক্ষী হিসেবে দেখতেন।
- সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরেও নেতৃত্বের প্রশ্নে নানা হিসাব-নিকাশ চলছিল।
- এমন প্রেক্ষাপটে তাঁকে সেনাবাহিনীর সক্রিয় দায়িত্ব থেকে সরিয়ে কূটনৈতিক দায়িত্বে পাঠানোর চিন্তা সামনে আসে বলে উল্লেখ রয়েছে।
কিন্তু ইতিহাসের এই জায়গাটিই সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক। এম. এ. হামিদের বর্ণনা অনুযায়ী, জিয়াউর রহমান বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন এবং বিভিন্ন মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর আস্থা ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করেন। সেখানে তোফায়েল আহমেদ ও আব্দুর রাজ্জাকের নামও আলোচনায় উঠে আসে।
বলা হয়, তৎকালীন রাজনৈতিক যোগাযোগ ও অনুরোধের মাধ্যমে বিষয়টি পুনর্বিবেচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
অর্থাৎ, ইতিহাসের এক ব্যাখ্যা অনুযায়ী, জিয়াউর রহমানের সম্ভাব্য কূটনৈতিক পোস্টিং বাতিলে রাজনৈতিক সহানুভূতি বা সমর্থনের একটি বড় ভূমিকা ছিল।
এখানেই ইতিহাসের সেই বিরাট প্রশ্নটি দাঁড়িয়ে যায়—যদি সেদিন জিয়াউর রহমান পূর্ব জার্মানিতে রাষ্ট্রদূত হিসেবে চলে যেতেই, তাহলে কি বাংলাদেশের ইতিহাস একই পথে প্রবাহিত হতো?
- তিনি কি সেনাবাহিনীর কেন্দ্রীয় ক্ষমতার অক্ষে অবস্থান করতে পারতেন?
- ১৫ আগস্ট-পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে তাঁর ভূমিকা আদৌ তৈরি হতো?
- তিনি কি সেনাপ্রধান হওয়ার সুযোগ পেতেন?
- কিংবা পরে রাষ্ট্রপতি হয়ে দেশের রাজনীতির অন্যতম নিয়ন্ত্রক শক্তি (বিএনপি গঠন ও নতুন রাজনৈতিক ধারা) হয়ে উঠতে পারতেন?
- বাংলাদেশের রাজনীতির গতিপথ কি আজকের মতো হতো?
অবশ্য ইতিহাসে “যদি” শব্দটির কোনো নিশ্চিত উত্তর নেই। কিন্তু ইতিহাসের গবেষণা, স্মৃতিচারণ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণে এই ধরনের প্রশ্নের স্থান চিরকালই রয়েছে। কারণ কোনো রাষ্ট্রের ইতিহাস শুধু সংঘটিত ঘটনার ইতিহাস নয়; বরং অঘটিত সম্ভাবনার ইতিহাসও কখনও কখনও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
তোফায়েল আহমেদের সঙ্গে জিয়াউর রহমানের একটি সুসম্পর্ক ও যোগাযোগ ছিল—এমন উল্লেখ বিভিন্ন স্মৃতিচারণ ও রাজনৈতিক আলাপচারিতায় পাওয়া যায়। বঙ্গবন্ধুর আস্থাভাজন ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমেদ যেমন একদিকে আওয়ামী রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ মুখ ছিলেন, তেমনি অন্যদিকে সেনাবাহিনীর কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সঙ্গেও তাঁর যোগাযোগ ছিল বলেই আলোচনা রয়েছে। সে সময়কার ক্ষমতার বলয়, রাজনৈতিক যোগাযোগ এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কের জটিল বাস্তবতা বিবেচনায় এই বিষয়গুলোকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই।
কিন্তু ইতিহাসের এক অদ্ভুত পরিহাস হয়তো এখানেই। যে জিয়াউর রহমানকে ঘিরে রাজনৈতিক সহমর্মিতা, বোঝাপড়া কিংবা সম্পর্কের প্রসঙ্গ আলোচনায় আসে, পরবর্তীকালে সেই জিয়াউর রহমানের হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক ধারাই বহু সময় তোফায়েল আহমেদকে রাজনৈতিকভাবে অবমূল্যায়ন করেছে—এমন অভিযোগ বা অনুভূতি রাজনৈতিক মহলে উচ্চারিত হয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন, বাংলাদেশের ক্ষমতার ইতিহাসে এমন বহু চরিত্র আছেন, যারা ঘটনাপ্রবাহের নির্মাণে ভূমিকা রেখেও পরবর্তীকালে সেই ইতিহাসের কেন্দ্র থেকে দূরে সরে গেছেন।
ইতিহাস তাই শুধু কৃতিত্বের তালিকা নয়; ইতিহাস কখনও কখনও নীরব বেদনার দলিলও। একজন মানুষ একটি সময়ে একটি সিদ্ধান্তে, একটি সুপারিশে বা একটি সম্পর্কের জায়গা থেকে যা করেন, তার দীর্ঘ ছায়া কখন কোন রাজনৈতিক বাস্তবতায় গিয়ে পড়ে—তা হয়তো তখন তিনি নিজেও জানেন না।
আজ তোফায়েল আহমেদের মৃত্যু সেই প্রশ্নগুলোকেই আবার সামনে নিয়ে এলো। হয়তো একদিন ইতিহাস আরও গভীরভাবে অনুসন্ধান করবে—একজন রাজনৈতিক নেতার একটি অনুরোধ, একটি সম্পর্ক বা একটি মধ্যস্থতা বাংলাদেশের ক্ষমতার ইতিহাসে কত দূর পর্যন্ত প্রতিধ্বনি তুলেছিল। আর হয়তো তখন ইতিহাস লিখবে—কিছু মানুষ কখনও কখনও ইতিহাস নির্মাণ করেন, অথচ সেই ইতিহাসের পূর্ণ স্বীকৃতি তাঁদের কপালে জোটে না।



