সাইফুল ইসলাম তানভীর, মানিকগঞ্জ আঞ্চলিক প্রতিনিধি:
মানিকগঞ্জের সিংগাইরে আখের গুড় উৎপাদনের হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন আখ চাষীরা।এছাড়া অল্প পরিশ্রমে লাভ বেশি হওয়ায় বেড়ে চলছে মুখে চিবিয়ে খাওয়া আখের চাষ । আর এ কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন উপজেলার প্রায় দেড় হাজার আখ চাষী। গুড় উৎপাদনে সিংগাইরের কৃষকদের মাঝে নতুন প্রাণের সঞ্চার করলেও কাঙ্খিত দাম না পাওয়া এবং গুড় উৎপাদন খরচ বেশি পরায় হতাশায় আখ চাষিরা। স্থানীয় বাজারের চাহিদা মিটিয়ে মুখে চিবিয়ে খাওয়া আখ চলে যাচ্ছে রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে। এ বছর সিংগাইর থেকে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ কোটি টাকার আখ ও আখের গুড় বিক্রি হবে হলে ধারণা করছে কৃষি অফিস।
জানা যায়, ৮০- ৯০ দশকে সিংগাইরে কৃষকদের প্রধান অর্থকরী ফসল হিসেবে পরিচিত ছিল আখ বা ইক্ষু। মিষ্টতা এবং স্বাদে সিংগাইরের আখ এবং গুড়ের খ্যাতি ও চাহিদা ছিল দেশজোড়া। আখের গুড় বিক্রির অর্থই ছিল প্রত্যেক পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস। আখ চাষ এবং আখ থেকে গুড় উৎপাদনে শ্রমিক সংকট, খরচের তুলনায় আখ ও গুড়ের কাঙ্খিত দাম না পাওয়াসহ নানা কারণে আখ চাষ ও আখের গুড় উৎপাদন সিংগাইর থেকে হারিয়ে গিয়েছিল।
সরজমিনের দেখা গেছে, ধল্লা ইউনিয়েনের মেদুলিয়া গ্রামের মো.নেসারউদ্দিন ও মো: মেজবাহ উদ্দিন ,আঠালিয়া গ্রামের মোঃ নাজিম উদ্দিন এবং জয়মন্টপ ইউনিয়নের ডিয়ারা গ্রামের মোঃ আব্দুল মাজেদের গুড় তৈরির খোলায় রাত-দিন চলছে গুড় উৎপাদনের কাজ। তাদের আখ ক্ষেতের পাশেই বসানো হয়েছে আখ মাড়াই কল বা যন্ত্র। এই জায়গাটুকুকে বলা হয় খোলা। আখ চাষিরা প্রথমে জমি থেকে আখ কেটে আটি বেঁধে মাথায় কিংবা ভ্যান গাড়িতে খোলায় নিয়ে আসে। এরপর সেই আখগুলো কলে ঢুকিয়ে রস বের করে। ওই রস চুলায় বসানো কড়াই এ ৩-৪ ঘন্টা আগুনে জাল দিয়ে বিশেষ প্রক্রিয়ায় গুড় তৈরি করছে। এরপর সেগুলোকে বড় মাটির পাত্রে (তৌলা) ভরে বিক্রির জন্য সংরক্ষণ করা হয়। এ কাজে জ্বালানি হিসেবে রৌদ্রে শুকানো আখের ছোবড়া এবং পাতা ব্যবহার করা হয়। কার্তিক মাস থেকে শুরু হয়ে প্রায় দুই মাস বা তারও বেশি সময় ধরে চলে গুড় উৎপাদনের এ প্রক্রিয়া ।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে উপজেলার বায়রা, আজিমপুর, বিনোদপুর, তালেবপুর, জামশা, ধল্লা এলাকায় প্রায় ৬৫০ হেক্টর জমিতে আখ চাষ হয়েছে। এর মধ্যে গুড় উৎপাদনের জন্য ঈশ্বরদী ১৬, ঈশ্বরদী ৩০, ঈশ্বরদী ৩৩, ঈশ্বরদী ৩৪ ও ঈশ্বরদী ৪০ জাতের প্রায় ২৫ হেক্টর এবং মুখে চিবিয়ে খাওয়ার জন্য অমৃত, বোম্বাই, রঙ্গবিলাশ, বিএসআরআই আখ ৪১-৪৩ ও দেশি জাতের প্রায় ৬২৫ হেক্টর। প্রতি বিঘায় ক্ষেত্র বিশেষে ৩৫ থেকে ৪৫ হাজার টাকা খরচ হয়। যা প্রায় ১লাখ ১ দশ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়ে থাকে। চাহিদা থাকায় পাইকাররা খেত থেকেই কেনেন। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে উৎপাদিত এসব আখ সাভার, কেরানীগঞ্জ ও রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি হচ্ছে। বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক হওয়ায় আখের আবাদে জড়িয়েছেন স্থানীয় প্রায় আড়াই হাজার কৃষক। আখের সঙ্গে বিভিন্ন সাথী ফসল করে বাড়তি আয় করছেন কৃষকরা।
ধল্লা ইউনিয়নের মেদুলিয়া গ্রামের আখ চাষী মো. নেসারউদ্দিন জানান , আগে সিংগাইরে প্রচুর পরিমাণে গুড় উৎপাদনের জন্য আখ চাষ হতো। এখন সেটা নেই বললেই চলে। আমি দুই বছর যাবৎ পুনরায় শুরু করেছি। আমর এখানে প্রতিদিন জনপ্রতি ৭০০ টাকা মজুরিতে আখ কাটা থেকে শুরু করে গুড় তৈরি পর্যন্ত সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ১০ জন শ্রমিক কাজ করছে । আমি এ বছর ৮ হেক্টর জমিতে আখ চাষ করেছি। ১ কড়াই রস জাল দিয়ে ৪০-৫০ কেজির মতো গুড় পাওয়া যায়। বর্তমানে প্রতি কেজি ১১০-১২০ টাকা করে বিক্রি করছি। আশা করছি এ বছর আমার প্রায় ২০লাখ টাকার মত গুড় বিক্রি হবে।
মুখে চিবিয়ে খাওয়া আখ চাষী বায়রা ইউনিয়নের নয়াবাড়ী গ্রামের পিয়ার আহমেদ বলেন, আমার পরিবারের সবাই মিলে এবার সাত বিঘা জমিতে আখের আবাদ করেছি। এর মধ্যে চার বিঘা জমিতে বোম্বাই, রঙ্গবিলাশ জাতের আখ বিক্রি করেছি। কৃষক মনোয়ার হোসেন বলেন, আমাদের বায়রা গ্রাম আখ চাষের জন্য বিখ্যাত। চার-পাঁচ পুরুষ আগে থেকে এখানে আখ চাষ করেন। এর ওপর একসময় আমাদের গ্রাম নির্ভরশীল ছিল।
মুখে চিবিযে খাওয়া আখের পাইকারি ব্যবসায়ী মাসুদুর রহমান জানান, আমি প্রতি বছর এই বায়রা ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম থেকে আখ কিনে নিয়ে তা ঢাকার বিভিন্ন বাজারে বিক্রি করি। ঢাকার সঙ্গে এখানকার যাতায়াত ব্যবস্থা ভালো হওয়ায় খেত থেকে কিনে নিয়ে যাই। আকার ও মানভেদে প্রতিটি আখ ১০ থেকে ১৫ টাকা দরে আমি কিনি। এ ছাড়া খেত থেকে তা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে আঁটি বেঁধে গাড়িতে লোড করে দিতে এক হাজার আখের জন্য শ্রমিকদের ১ হাজার ৬০০ টাকা দিতে হয়।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. হাবিবুল বাশার চৌধুরী বলেন, আগের চেয়ে গুড় উৎপাদনের আখ চাষ কমে গেলেও বেড়েছে মুখে চিবিয়ে খাওয়া আখের চাষ। এ মৌসুমে আগের চেয়ে ৫০ হেক্টর বেশি জমিতে আখের আবাদ হয়েছে। বিঘা প্রতি কৃষকরা প্রায় ৮০ হাজার টাকার গুড় বিক্রি করছে এবং ৮০ হাজার থেকে লাখ টাকার চিবিয়ে খাওয়া আখ বিক্রি করেছেন। সে হিসাবে উপজেলা থেকে প্রায় ৪০ কোটি টাকার আখ ও গুড় বিক্রি হবে। আখ চাষে যদি কেউ আমাদের সহযোগিতা চায় তাহলে আমরা তাদের পরামর্শ দিয়ে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে বলেও তিনি জানান।


