গেজেট থেকে বাদ পড়েছে শুধু একটি নাম নয়, ভেঙে গেছে একটি পরিবারের সাত বছরের স্বপ্ন! ৪৫তম বিসিএসে অডিট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েও গেজেটে স্থান পাননি সুমি আকতার। দীর্ঘ সাত বছরের সাধনা, অসংখ্য নির্ঘুম রাত, ব্যক্তিগত ত্যাগ আর বুকভরা স্বপ্নের পরও রাষ্ট্রের গেজেটে নাম না আসায় হতাশা, ক্ষোভ ও ন্যায়বিচারের আকুতি জানিয়েছেন তিনি।
নিজের এই পরিস্থিতিকে শুধু ব্যক্তিগত বঞ্চনা নয়, বরং একটি পরিবারের দীর্ঘদিনের স্বপ্নভঙ্গ হিসেবে তুলে ধরেছেন সুমি আকতার।
তাঁর প্রশ্ন, কেন তিনি গেজেট থেকে বাদ পড়লেন? তাঁর অপরাধটা কী? তিনি কি কখনো রাষ্ট্রের ক্ষতি করেছেন? তিনি কি দেশের সেবা করার অযোগ্য? নাকি তাঁর সাত বছরের পরিশ্রম, মেধা, যোগ্যতা ও স্বপ্নের কোনো মূল্যই নেই রাষ্ট্রের কাছে?
এক আবেগঘন বক্তব্যে সুমি আকতার তুলে ধরেছেন তাঁর বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ত্যাগ ও প্রত্যাশার কথা। যে বাবা-মা নিজেদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে সন্তানের সাফল্যের স্বপ্ন দেখেছেন, বুকভরা আশা নিয়ে অপেক্ষা করেছেন সন্তানের প্রতিষ্ঠিত হওয়ার দিনের জন্য, তাঁদের সেই স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার দায় কে নেবে এমন প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
সুমি আকতারের ভাষায়, একজন সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থীর নাম গেজেটে না থাকা কর্তৃপক্ষের কাছে হয়তো একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তমাত্র। কিন্তু তাঁর কাছে এটি সাত বছরের সাধনার অপমৃত্যু, বাবা-মায়ের ত্যাগের অবমূল্যায়ন, পরিবারের স্বপ্নভঙ্গ এবং তাঁর নয় মাসের নিষ্পাপ শিশুসন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা।
সুমি আকতারেরও ছিল একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন। বৃদ্ধ বাবা-মায়ের মুখে হাসি ফোটানো, পরিবারের পাশে দাঁড়ানো এবং ছোট্ট সন্তানকে সুন্দর ভবিষ্যৎ উপহার দেওয়ার প্রত্যাশা ছিল তাঁর। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের সেবা করার মধ্য দিয়ে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন তিনি।
কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে নিজের পরিবারের সামনে দাঁড়িয়েও কোনো সান্ত্বনা দিতে পারছেন না বলে জানিয়েছেন সুমি আকতার।
একজন সন্তান, পরিবারের সদস্য হিসেবে নিজের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরে তিনি জানান, তাঁর এই লড়াই শুধু নিজের জন্য ছিল না; ছিল বাবা-মায়ের স্বপ্ন পূরণ, পরিবারের মুখে হাসি ফোটানো এবং সন্তানের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার জন্যও।
রাষ্ট্রের কাছে প্রশ্ন রেখে সুমি আকতার বলেন, সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পরও যদি একজন প্রার্থীকে গেজেট থেকে বঞ্চিত হতে হয়, তবে তাঁর সাত বছরের পরিশ্রমের দায় কে নেবে? তাঁর পরিবারকে যে স্বপ্নভঙ্গের যন্ত্রণা সহ্য করতে হচ্ছে, তার জবাবই বা কে দেবে?
তবে সুমি আকতার স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, তিনি করুণা চান না; চান ন্যায়বিচার। তাঁর প্রতি নেওয়া সিদ্ধান্তের স্বচ্ছ ব্যাখ্যা চান তিনি। যদি কোনো অভিযোগ থাকে, তাহলে তার ন্যায্য মূল্যায়ন করতে হবে। আর যদি তাঁর প্রতি অন্যায় হয়ে থাকে, তাহলে সেই অন্যায়ের প্রতিকার নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি চান, তাঁর মতো আর কোনো স্বপ্নবাজ মানুষকে যেন এভাবে অসহায় হয়ে প্রশ্ন করতে না হয় দেশের সেবা করতে চাওয়াটাই কি তাঁর অপরাধ?
নিজের বক্তব্যের শেষাংশে সুমি আকতার তুলে ধরেছেন বুকভরা কষ্ট, বাবা-মায়ের প্রতি অপরাধবোধ, পরিবারের প্রতি অসহায়ত্ব এবং ছোট্ট সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগের কথা। তাঁর আশঙ্কা, তাঁর চোখের জল হয়তো অনেকের চোখে পড়বে না, বাবা-মায়ের দীর্ঘশ্বাসও হয়তো অনেকের কানে পৌঁছাবে না। তবু তিনি বিশ্বাস করেন, ন্যায়বিচারের ঊর্ধ্বে কেউ নন।
মানুষের কাছে নিজের আকুতি জানিয়ে চূড়ান্ত বিচার মহান আল্লাহর হাতে ছেড়ে দিয়েছেন সুমি আকতার। আল্লাহ যেন তাঁর বাবা-মায়ের চোখের জলের মর্যাদা দেন, তাঁর সন্তানের ভবিষ্যৎ রক্ষা করেন এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়সংগতভাবে লড়াই করার শক্তি দেন এমন প্রার্থনাও করেছেন তিনি।
সুমি আকতারের বক্তব্যের শেষ কথাটি ছিল দৃঢ় প্রত্যয়ের “আমি দয়া চাই না, আমি আমার ন্যায্য অধিকার চাই।”
আরু|



