দেশে দীর্ঘদিন ধরে চলা গ্যাস সংকটের কোনো উন্নতি না হওয়ায় বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে শিল্প খাত। গ্যাসের অভাবে দেশের ১ হাজার ৮০০টির বেশি টেক্সটাইল মিলের মধ্যে ৯০০-এরও বেশি মিল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। একই সঙ্গে তৈরি পোশাক, ইস্পাত, কাগজ, সিরামিক ও পার্টিকেল বোর্ডসহ গ্যাসনির্ভর বিভিন্ন শিল্পে উৎপাদন সক্ষমতা অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে।
শিল্পোদ্যোক্তারা বলছেন, সরকারের পক্ষ থেকে একাধিকবার গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করার আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে পরিস্থিতির তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। বরং নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, সাভার, ময়মনসিংহ, মানিকগঞ্জ ও নরসিংদীর বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে কোথাও সামান্য উন্নতির পর আবারও গ্যাসের চাপ কমে গেছে।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল জানিয়েছেন, সংগঠনটির ১ হাজার ৮০০-এর বেশি সদস্যের মধ্যে ৯০০-এরও বেশি টেক্সটাইল মিল বর্তমানে গ্যাস সংকটের কারণে সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে।
তার ভাষ্য, শুধু টেক্সটাইল নয়, গ্যাসনির্ভর ইস্পাত, কাগজ, সিরামিক ও পার্টিকেল বোর্ড শিল্পও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানান, নারায়ণগঞ্জে একদিন গ্যাস সরবরাহে সামান্য উন্নতি দেখা গেলেও পরদিন পরিস্থিতি আবারও খারাপ হয়ে যায়।
নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারের একটি স্পিনিং মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, তার কারখানায় গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে। এতে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি টাকা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন তারা। এমন পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের বেতন ও কারখানার গ্যাস-বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
ফতুল্লা ডাইং অ্যান্ড ক্যালেন্ডারিং লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিনহাজ হক বলেন, গ্যাস পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার বিষয়ে সরকার একাধিকবার আশ্বাস দিলেও সেই সময়সীমাগুলো পার হয়ে গেছে। এখন পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে, সে বিষয়ে শিল্প মালিকরা কোনো স্পষ্ট ধারণা পাচ্ছেন না।
এদিকে নরসিংদীর মাধবদীতে গ্যাস ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের দাবিতে তাঁত শ্রমিকদের বিক্ষোভের খবরও পাওয়া গেছে। নরসিংদী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি আবদুল্লাহ আল মামুনের দাবি, উৎপাদন বন্ধ থাকায় তাঁত শ্রমিকদের আয়ও বন্ধ হয়ে গেছে। কারণ তাদের বড় একটি অংশ উৎপাদনভিত্তিক মজুরি পান। তবে মাধবদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামাল হোসেন এমন কোনো বিক্ষোভের খবর অস্বীকার করেছেন।
শিল্প খাতে চলমান এই সংকটের সূত্রপাত গত ২১ জুলাই। ওইদিন মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে (এফএসআরইউ) অগ্নিকাণ্ড ও কারিগরি ত্রুটির পর জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এরপর থেকেই দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে তীব্র গ্যাস সংকট চলছে।
সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতির আশ্বাস দেওয়া হলেও সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ায় শিল্প মালিকদের মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগ। তাদের আশঙ্কা, গ্যাস সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক না হলে কারখানা বন্ধের সংখ্যা আরও বাড়বে, উৎপাদন ও রপ্তানি ব্যাহত হবে এবং বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের কর্মসংস্থানও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
আরু|



