সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে আগামী ৪৮ ঘণ্টায় দেশের আট বিভাগে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দিয়েছে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর। এর প্রভাবে চট্টগ্রাম মহানগরে জলাবদ্ধতা এবং জেলার পাহাড়ি এলাকায় ভয়াবহ ভূমিধসের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
বুধবার (৮ জুলাই) দুপুরে আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ খো. হাফিজুর রহমান স্বাক্ষরিত সতর্কবার্তায় জানানো হয়, রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের বিভিন্ন স্থানে আগামী ২৪ ঘণ্টায় ৪৪ থেকে ৮৮ মিলিমিটার পর্যন্ত ভারী এবং কোথাও কোথাও ৮৮ মিলিমিটারের বেশি অতি ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, টানা ভারী বর্ষণের কারণে চট্টগ্রাম মহানগরের বিভিন্ন এলাকায় সাময়িক জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হতে পারে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম বিভাগের পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের আশঙ্কাও রয়েছে।
এরই মধ্যে কয়েকদিনের টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রাম অঞ্চলের জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের তথ্যমতে, বুধবার সকাল ৯টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ২৩৭ দশমিক ৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে এখনও ৬ হাজার ৫৫৮ পরিবার
চট্টগ্রাম পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির তথ্য অনুযায়ী, অতীতের ভয়াবহ ভূমিধস, উচ্ছেদ অভিযান এবং আদালতের নির্দেশনা সত্ত্বেও নগরের ২৬টি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে এখনও ৬ হাজার ৫৫৮টি পরিবার বসবাস করছে।
সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে বাটালি হিল, মতিঝর্ণা, আকবরশাহ, কুসুমবাগ, বায়েজিদ বোস্তামী, রৌফাবাদ, ফয়’স লেক ও খুলশী এলাকার পাহাড়গুলোকে।
জেলা প্রশাসন এসব পাহাড়কে পাঁচটি জোনে ভাগ করে প্রতিটি জোনে একজন করে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দিয়েছে।
বর্তমানে বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দারা আশ্রয় নিতে শুরু করেছেন। ব্র্যাক প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় ১১০ জন, ওয়াইডব্লিউসিএ কমিউনিটি স্কুলে ৪০ জন, ইলমুল কোরআন মাদ্রাসায় ৫০ জন এবং আল হেরা মাদ্রাসায় ১৫ জন আশ্রয় নিয়েছেন। প্রশাসনের ধারণা, রাতে আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
দুই দিনে চট্টগ্রাম-কক্সবাজারে ১১ জনের মৃত্যু
টানা বর্ষণের মধ্যে গত দুই দিনে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে পৃথক দুর্ঘটনায় অন্তত ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে।
চট্টগ্রামে পাঁচলাইশের রহমাননগরে দেয়াল ধসে শফিকুর রহমান (৩০) নামে এক যুবক এবং রাঙ্গুনিয়ায় পাহাড়ধসে রেনু আক্তার (৫৬) নামে এক নারী নিহত হয়েছেন।
এর আগে সোমবার দিবাগত রাতে কক্সবাজারের উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পৃথক তিনটি পাহাড়ধসে নারী ও শিশুসহ নয়জন নিহত হন।
উপজেলাগুলোতেও বাড়ছে ঝুঁকি
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড, রাঙ্গুনিয়া, লোহাগাড়া ও ফটিকছড়িসহ বিভিন্ন পাহাড়ি উপজেলায়ও ভূমিধসের ঝুঁকি বেড়েছে।
সীতাকুণ্ড উপজেলা প্রশাসন পাহাড়ের পাদদেশ ও ঢালু এলাকায় বসবাসকারীদের দ্রুত আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। জঙ্গল সলিমপুর, সোনাইছড়ি, কুমিরা, বাঁশবাড়ীয়া, বারৈয়াঢালা, বাড়বকুণ্ড ও মুরাদপুর এলাকার মানুষকে বিশেষ সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।

লোহাগাড়া উপজেলা প্রশাসন চুনতি, পুটিবিলা ও পার্শ্ববর্তী পাহাড়ি এলাকায় মাইকিং শুরু করেছে। প্রয়োজন হলে ইউনিয়নভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবক দল গঠনেরও প্রস্তুতি রয়েছে।
রাঙ্গুনিয়াতেও মাইকিংয়ের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম চলছে।
অতীতের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা
বাংলাদেশ ল্যান্ডস্লাইড ডেটাবেজের তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে চট্টগ্রামে ভূমিধসে ২৭৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ২০০৭ সালের জুনে কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে ভয়াবহ ভূমিধসে প্রাণ হারান ১২৮ জন।
গবেষকদের মতে, পাহাড় কাটা, বন উজাড়, অপরিকল্পিত বসতি, দুর্বল ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং দীর্ঘস্থায়ী বৃষ্টিপাতই চট্টগ্রামে ভূমিধসের প্রধান কারণ।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক আলক পাল বলেন, বাংলাদেশের পাহাড়ের মাটি তুলনামূলক নরম ও আলগা হওয়ায় দীর্ঘস্থায়ী বৃষ্টিতে সহজেই ভূমিধসের ঝুঁকি তৈরি হয়।
নগর পরিকল্পনাবিদ দেলোয়ার মজুমদার বলেন, কেবল বর্ষাকালে মানুষকে সরিয়ে নেওয়া স্থায়ী সমাধান নয়। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বসবাসকারীদের পুনর্বাসন এবং সাশ্রয়ী আবাসনের ব্যবস্থা না হলে প্রতিবছর একই সংকট ফিরে আসবে।
জরুরি সেবা নিশ্চিত করতে র্যাপিড রেসপন্স টিম
টানা বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা ও পাহাড়ধসের আশঙ্কার মধ্যে জরুরি সেবা নিশ্চিত করতে ১০১ সদস্যের র্যাপিড রেসপন্স টিম গঠন করেছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন।
চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, রেড ক্রিসেন্টের স্বেচ্ছাসেবকদের সহযোগিতায় সার্বক্ষণিক মনিটরিং সেল চালু করা হয়েছে। যেকোনো দুর্যোগে র্যাপিড রেসপন্স টিম তাৎক্ষণিকভাবে মাঠে কাজ করবে।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম বলেন, “আগে জীবন, তারপর অন্য সবকিছু। ঝুঁকি নিয়ে কোনো অবস্থাতেই পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থান করবেন না। প্রয়োজন হলে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যান।”
আরু/


