মানুষের জীবনে কিছু ঘটনা থাকে, যা কেবল ব্যক্তিগত নয়; সময়ের সাক্ষী হয়ে ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়। কিছু মানুষের জীবনও তেমনি। তাদের পথচলা শুধু একটি চাকরি, একটি পদ বা একটি পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। সংগ্রাম, সাহস, অপবাদ, বৈষম্য এবং শেষ পর্যন্ত ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা—সবকিছু মিলিয়ে তারা হয়ে ওঠেন এক একটি জীবন্ত অধ্যায়।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কর্মকর্তা মোহাম্মদ জসিম উদ্দিনকে দেখলে আমার বারবার এমনই মনে হয়।
দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনে অসংখ্য পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। কেউ এসেছেন, কেউ চলে গেছেন। অনেকেই ক্ষমতার প্রভাবে আলোচিত হয়েছেন, আবার সময়ের সঙ্গে হারিয়েও গেছেন। কিন্তু কিছু মানুষ আছেন, যাদের স্মরণ করতে হয় তাদের ব্যক্তিত্ব, সততা, সাহস এবং কর্মনিষ্ঠার জন্য। জসিম উদ্দিন সেই বিরল শ্রেণির একজন কর্মকর্তা।
আমি তাকে চিনি প্রায় তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে। চাকরি জীবনের শুরু হওয়ার আগ থেকেই তাকে কাছ থেকে দেখেছি। একজন তরুণ পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে তার মধ্যে যে আত্মবিশ্বাস, সাহস এবং পেশাগত সততা দেখেছিলাম, তা আজও অটুট রয়েছে।
সেই সময় দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন ছিল অস্থির। ক্ষমতার পালাবদল, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এবং প্রশাসনিক চাপ—সবকিছু মিলিয়ে ছিল এক ভিন্ন বাস্তবতা। সেই বাস্তবতায় একদিন আমি এবং এম. এ. হাশেম রাজুকে সঙ্গে নিয়ে জসিম উদ্দিন গিয়েছিলেন বিএনপির প্রভাবশালী নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বাসভবনে। বহদ্দারহাটে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর জনসভার জন্য পুলিশের অনুমতি নেওয়ার দায়িত্ব আমার ওপর ছিল। সে সময় জসিম উদ্দিন চান্দগাঁও থানার এসআই হিসেবে কর্মরত ছিলেন। সেই সূত্রেই তিনি সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বাসায় গিয়েছিলেন।
ঘটনাটি তখনকার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অনেকের চোখে ভিন্ন অর্থ বহন করেছিল। বিষয়টি গোয়েন্দা সংস্থার নজরেও আসে। বিশেষ করে ডিজিএফআইয়ের এক কর্মকর্তা জসিম উদ্দিনকে চাকরি থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন বলে জানা যায়। পুরো বিষয়টি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আমিও ভূমিকা রেখেছিলাম। প্রশাসনের ভেতরে-বাইরে নানা আলোচনা শুরু হয়।
আমি আজও স্পষ্ট মনে করতে পারি, তখন তাকে সতর্ক করা হয়েছিল। চাকরি হারানোর আশঙ্কার কথাও বলা হয়েছিল। কিন্তু তরুণ সেই পুলিশ কর্মকর্তা বিন্দুমাত্র বিচলিত হননি।
তিনি বলেছিলেন, “আমি কোনো অপরাধ করিনি। একজন জাতীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতাকে সম্মান জানাতে গিয়েছি। যদি এ কারণে চাকরি চলে যায়, তবুও আমি অনুতপ্ত নই।”
সেই সাহসী উচ্চারণ আজও আমার স্মৃতিতে অমলিন। কারণ সত্যিকার সাহস তখনই প্রকাশ পায়, যখন মানুষ জানে সামনে ঝুঁকি রয়েছে, তবুও সত্যকে আঁকড়ে ধরে।
এরপর দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অনেক পরিবর্তন এসেছে। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী গ্রেফতার হয়েছেন, বিচার হয়েছে এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। কিন্তু সেই সময়ের রাজনৈতিক উত্তাপের ছায়া অনেক মানুষের কর্মজীবনে দীর্ঘদিন ধরে রয়ে গেছে। জসিম উদ্দিনও সেই বাস্তবতার বাইরে ছিলেন না।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রজীবনে তিনি ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। কিন্তু পুলিশ বাহিনীতে যোগদানের পর তিনি নিজেকে একজন পেশাদার কর্মকর্তা হিসেবেই গড়ে তুলেছেন। তবুও দীর্ঘ সময় ধরে তাকে নানা সন্দেহ, অপপ্রচার এবং অদৃশ্য বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছে বলে অনেকেই মনে করেন।
তার কর্মজীবনের দিকে তাকালে দেখা যায়, যেখানে দায়িত্ব পেয়েছেন, সেখানেই তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেছেন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, অপরাধ দমন এবং জনসাধারণের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন—সবক্ষেত্রেই তিনি নিজের সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছেন।
জাতীয় নির্বাচনের আগে তিনি চান্দগাঁও থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। সেই সময় একটি রাজনৈতিক দলের প্রার্থীর অভিযোগের প্রেক্ষাপটে তাকে হঠাৎ করে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়।
সেই সিদ্ধান্তের পর অনেকেই বিস্মিত হয়েছিলেন। কারণ যারা তাকে কাছ থেকে চিনতেন, তারা জানতেন জসিম উদ্দিনের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তার সঙ্গে বাস্তবতার বিস্তর ফারাক রয়েছে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেটি আরও পরিষ্কার হয়ে ওঠে।
তৎকালীন পুলিশ কমিশনার হাসিব আজিজ বিষয়টি গভীরভাবে পর্যালোচনা করেন। তিনি উপলব্ধি করেন যে অভিযোগের আড়ালে একজন দক্ষ ও পেশাদার কর্মকর্তাকে অন্যায়ভাবে বিতর্কের মধ্যে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।
ফলে তিনি জসিম উদ্দিনকে পুলিশ লাইন থেকে নগর গোয়েন্দা বিভাগে (ডিবি) পদায়ন করেন। এটিই ছিল তার প্রতি প্রশাসনিক আস্থার প্রথম বড় স্বীকৃতি।
শুধু তাই নয়, চট্টগ্রাম থেকে বিদায় নেওয়ার আগে হাসিব আজিজ তাকে পুনরায় ওসি করার আগ্রহও প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে জসিম উদ্দিন তখন সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেননি।
পরবর্তীতে তিনি পাহাড়তলী থানার ওসি হিসেবে দায়িত্ব পান। পাহাড়তলীতে তার কর্মকাণ্ড সাধারণ মানুষের প্রশংসা অর্জন করে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি তিনি জনমুখী পুলিশিংয়েরও পরিচয় দেন।
সেখান থেকে তিনি বায়েজিদ থানার ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব সম্পন্ন করেন।
এরপর আসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের বর্তমান কমিশনার শওকত আলী দায়িত্ব গ্রহণের পর কর্মকর্তাদের কর্মদক্ষতা, অভিজ্ঞতা এবং অতীতের ঘটনাগুলো নতুনভাবে মূল্যায়ন শুরু করেন।
তিনি শুধু কাগজের রিপোর্ট দেখেননি; দেখেছেন একজন কর্মকর্তার পুরো কর্মজীবনের ধারাবাহিকতা। তিনি উপলব্ধি করেছেন, যাকে একসময় অভিযোগের কারণে চান্দগাঁও থানা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, সেই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো সময়ের পরীক্ষায় টেকেনি।
বরং তার সততা, দক্ষতা ও পেশাদারিত্ব বারবার প্রমাণিত হয়েছে।
ফলাফল হিসেবে তিনি একটি সাহসী এবং দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নেন। মোহাম্মদ জসিম উদ্দিনকে আবারও চান্দগাঁও থানার অফিসার ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব প্রদান করেন।
অনেকের কাছে এটি শুধুমাত্র একটি পদায়ন। কিন্তু বাস্তবে এটি একটি বার্তা।
এই বার্তা হলো—মিথ্যা অপবাদ সাময়িকভাবে একজন মানুষকে আটকে রাখতে পারে, কিন্তু তার যোগ্যতাকে চিরদিন চাপা দিয়ে রাখা যায় না।
এই বার্তা হলো—সততা ও কর্মনিষ্ঠার মূল্যায়ন একদিন না একদিন হবেই।
আর এই বার্তা হলো—প্রশাসনে এখনও এমন নেতৃত্ব রয়েছে, যারা ব্যক্তি নয়, যোগ্যতাকে মূল্য দেয়।
পুলিশ কমিশনার শওকত আলীর এই সিদ্ধান্তের প্রশংসা করা উচিত। কারণ একজন প্রশাসকের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো সঠিক মানুষকে সঠিক জায়গায় বসানোর সক্ষমতা।
আজ যখন জসিম উদ্দিন আবার চান্দগাঁও থানার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন, তখন এটি শুধু একজন কর্মকর্তার কর্মস্থল পরিবর্তনের ঘটনা নয়।
এটি একটি দীর্ঘ সংগ্রামের স্বীকৃতি।
এটি অপবাদের বিরুদ্ধে সত্যের বিজয়।
এটি বৈষম্যের বিরুদ্ধে যোগ্যতার জয়।
এটি একজন পেশাদার পুলিশ কর্মকর্তার নীরব কিন্তু গৌরবময় প্রত্যাবর্তনের গল্প।
আমার বিশ্বাস, ওসি মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন তার অভিজ্ঞতা, সততা এবং কর্মদক্ষতা দিয়ে চান্দগাঁও থানাকে আরও কার্যকর ও জনবান্ধব থানায় পরিণত করবেন।
আর পুলিশ কমিশনার শওকত আলীর এই বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতেও সিএমপির কর্মকর্তাদের জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা হয়ে থাকবে—সত্য, সততা ও যোগ্যতার মূল্য শেষ পর্যন্ত অবশ্যই প্রতিষ্ঠিত হয়।
আরু/



