১৯৬৯-এর গণ-আন্দোলনের মহানায়ক তোফায়েল আহমেদ আজ আমাদের মাঝে নেই, তিনি পাড়ি জমিয়েছেন পরপারে। এই পৃথিবীতে নায়কের অভাব হয় না, তবে ইতিহাসের পাতায় ‘মহানায়ক’ হয়ে উঠতে পারেন কেবল গুটি কয়েকজন।
সমগ্র দেশ তোফায়েল আহমেদকে চেনে ’৬৯-এর সেই ঐতিহাসিক গণ-আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে। তবে আমার কাছে তাঁর পরিচিতিটা একটু ভিন্ন, কিছুটা ব্যক্তিগত ও আবেগের। ১৯৬২ সালের কথা; চট্টগ্রামে তখন স্কাউট জাম্বুরি অনুষ্ঠিত হচ্ছিল। সেই জাম্বুরিতে যোগ দিতে বরিশাল থেকে এসেছিলেন তোফায়েল আহমেদ, আর টাঙ্গাইল থেকে এসেছিলেন লতিফ ভাই (লতিফ সিদ্দিকী)। চট্টগ্রামের সেই প্রাঙ্গণেই তাঁদের প্রথম পরিচয়।
সেই পরিচয়ের সূত্র ধরে পরবর্তীতে তাঁদের মধ্যে শত শত চিঠির আদান-প্রদান হয়েছিল, গড়ে উঠেছিল এক নিবিড় সখ্যতা।
হঠাৎ একদিন যখন জানতে পারলাম—’৬৯-এর উত্তাল গণ-আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন আমাদের সেই পরিচিত মুখটিই, তখন আনন্দে ও গর্বে বুকটা ভরে উঠেছিল।
বাঙালির যত গুণ আছে, ছোটখাটো কিছু দোষও আছে। আমরা অতীতের অনেক কিছু ভুলে যেতে চাই, অস্বীকার করতে চাই। ’৬৯-এর গণ-আন্দোলনে যদি তোফায়েল আহমেদ না থাকতেন, যদি বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানের কারাগার থেকে না বের করে আনতে পারতাম, বঙ্গবন্ধু যদি ’৬৯-এ মুক্তি না পেতেন, আইয়ুব খানের বিদায় না হতো, তাহলে আজ বাংলাদেশ হতো না। পাকিস্তানের পর ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন, তারপর ’৫৪ সালে নির্বাচন হয়েছিল এবং ’৬২-তে শিক্ষা কমিশন—এসব আন্দোলন মুক্তিযুদ্ধের ভিত। বিশেষ করে ’৬৯-এর ২২ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানের কারাগার থেকে আমরা বের করে এনেছিলাম। সেই আন্দোলনের নেতা ছিলেন মহানায়ক তোফায়েল আহমেদ।
আজ কোনো বিতর্কিত কথায় যেতে ইচ্ছা করছে না।
তোফায়েল আহমেদ রক্ষীবাহিনী দেখাশোনা করতেন, এটা পরে শুনেছি। বঙ্গবন্ধু মারা যাওয়ার আগে কোনো দিনও শুনিনি যে রক্ষীবাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছেন মহানায়ক তোফায়েল আহমেদ। পরে অনেকে অনেক ইনিয়ে-বিনিয়ে অনেক কথা বলেছেন।
আমাদের দেশে যাঁরা সফল হন, যাঁরা বড় ভূমিকা নেন, তাঁদের পক্ষে অজস্র মানুষ থাকে, বিপক্ষেও অনেক শক্তি থাকে। তোফায়েল আহমেদেরও তেমনি ছিল। নানাজন তাঁকে নাজেহাল করার চেষ্টা করেছিল। একটা কথা আমি শুনেছি, রক্ষীবাহিনী গিয়েছিল তাঁর হুকুম চাইতে। যুদ্ধে সব সময় হুকুম লাগে না। তোফায়েল আহমেদ হুকুম দিলেই রক্ষীবাহিনী একদম ঝাঁপিয়ে পড়ত? কি করেছিল রক্ষীবাহিনী? কিন্তু ঝাঁপিয়ে পড়েনি। আর রক্ষীবাহিনীর অস্ত্র নিজেদের ঘরে রাখা হয়নি। রাখা হয়েছিল পিলখানায়। অন্যের অস্ত্রাগারে অস্ত্র রেখে কোনো যোদ্ধা যুদ্ধ করতে পারেন না।
আমার কাছে মনে হয়েছে, বঙ্গবন্ধু তো শারীরিকভাবে নিহত হয়েছিলেন, তাঁর সহকর্মীদের রাজনৈতিকভাবে হত্যা করার উদ্দেশ্যে শত্রুপক্ষ তোফায়েল আহমেদের বিরুদ্ধে এ রকম অভিযোগ এনেছিল। ’৭৫-এর ঘটনার প্রতিবাদের জন্য কারো তেমন অনুমতির প্রয়োজন হয়, এটা একটা বানানো কথা।
সারা বাংলাদেশে, পাকিস্তানে আলোড়ন সৃষ্টিকারী তোফায়েল আহমেদ ’৬৯-এর তোফায়েল আহমেদ। আর আমাদের কাছে ’৬২-এর তোফায়েল আহমেদ।
এখন কিছু হলেই মার্সিটিজে চড়েন, পাজেরোতে চড়েন। কিন্তু তখন পূর্ব পাকিস্তান তোফায়েল আহমেদের হাতের মুঠোয় ছিল, তখনো তাঁরা বাসে করে টাঙ্গাইলে এসে রাজনৈতিক প্রোগ্রাম করেছেন। এখন যে যাই বলুন, বঙ্গবন্ধু তোফায়েলের মতো অত বড় দরের নেতা, অত বড় সংগঠক পেয়েছিলেন। তিনি স্বাধীনতা পর্যন্ত যেতে পেরেছিলেন এবং স্বাধীনতা অর্জন করেছিলেন।
তোফায়েল আহমেদ আমার বড় ভাই লতিফ সিদ্দিকীর বন্ধু। কিন্তু আমার সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ আমাকে অনেক দূর নিয়ে যায়। অনেক কিছুর সাক্ষী আমি।
একটি ঘটনা আমি বলি—ভোলার একটা উপনির্বাচনে গিয়েছিলাম। সাত দিনের মতো ছিলেন আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা। আমি প্রায় ১৬ দিন সেখানে ছিলাম। ইসহাক আলি পান্না নামের একটা অসাধারণ ছেলেকে আমি সেখানে পেয়েছিলাম। যে পরে ছাত্রলীগের সভাপতি হয়েছিল। সেইখানে এই ১৫-১৬টা দিন তোফায়েল আহমেদকে অন্য মানুষ দেখেছি, কর্মীদের থাকা-খাওয়া, আমাদের খোঁজখবর নেওয়া—কোনোখানেই কোনো ক্লান্তি ছিল না। তাঁর স্ত্রী ছিলেন মায়ের মতো। আর কিছু না হোক, খাওয়া দাওয়া প্রশ্নে অসাধারণ একজন মানুষ।
আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন তোফায়েল আহমেদকে মাফ করে দিয়ে বেহেশত নসিব করেন। আসলে কষ্ট হয়, যাঁদের জাতীয় সম্মান পাওয়ার কথা ছিল, তা তাঁরা কেউ পাননি। তোফায়েল আহমেদও পাননি। সরকারিভাবে পাননি, দলীয়ভাবেও পাননি। আমির হোসেন আমু প্রায় ৯০ বছরের কাছাকাছি বয়স, তিনি আজ জেলখানায় পড়ে আছেন। এমএ জলিল একটা অসাধারণ মানুষ, কোনো সম্মান পাননি। আজ যাঁরাই আছেন, জাতির তাঁদেরকে সম্মান দেওয়া উচিত ছিল।
বীর মহাবীর জীবনে অনেকে একবার হন। কিন্তু তোফায়েল আহমেদ ’৬৯-এর যেমনি মহানায়ক, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধেও তেমনি মহানায়ক। মানুষের অনেক ব্যর্থতা থাকে, ভুল থাকে, ভ্রান্তি থাকে। তারপরও আমি মনে করি, তোফায়েল আহমেদ সমস্ত ভুলভ্রান্তির ঊর্ধ্বে সফল রাজনীতিবিদ।



