পর্যটকদের ফেলে যাওয়া প্লাস্টিক বর্জ্যে দূষিত হচ্ছে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত ও সামুদ্রিক পরিবেশ। এ দূষণের ক্ষতিকর প্রভাব তুলে ধরে সচেতনতা তৈরিতে সৈকতে ব্যতিক্রমী প্রচারণা চালিয়েছে বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন। বর্জ্য দিয়ে শরীর ঢেকে ১২ জন স্বেচ্ছাসেবী সেজেছেন ‘বর্জ্যমানব’। তাদের মাধ্যমে পর্যটকদের দেওয়া হচ্ছে সৈকত পরিষ্কার রাখা ও প্লাস্টিক ব্যবহার কমানোর বার্তা।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) সকালে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের সুগন্ধা পয়েন্টে দেখা যায় ব্যতিক্রমী এ আয়োজন। কারও শরীরে প্লাস্টিকের বোতল, মগ ও ছোট বালতি, কারও শরীরে প্লাস্টিকের থালা। আবার কেউ পরেছেন বিভিন্ন ধরনের ইলেকট্রনিক বর্জ্য। তাদের এমন উপস্থিতি দেখে কৌতূহলী হয়ে ওঠেন পর্যটকেরা। অনেকে ছবি তোলেন, কেউ কেউ মুঠোফোনে ভিডিও ধারণ করেন।
প্লাস্টিকদূষণ ও পরিবেশ সংরক্ষণে সচেতনতা বাড়াতে সকালে সৈকতের লাবণী পয়েন্ট থেকে একটি শোভাযাত্রা বের করা হয়। এতে দুই শতাধিক শিক্ষার্থী, পরিবেশকর্মী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি অংশ নেন। শোভাযাত্রায় থাকা ১২ ‘বর্জ্যমানব’ সৈকতে ঘুরে ঘুরে পর্যটকদের উদ্দেশে বলেন, সৈকত আমাদের অমূল্য সম্পদ। এর সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতা রক্ষা করতে হবে। যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলা থেকে বিরত থাকতে হবে এবং প্লাস্টিক ব্যবহারে সচেতন হতে হবে।
শোভাযাত্রায় নেতৃত্ব দেন কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক আব্দুল মান্নান। তিনি বলেন, গত ১০ দিনে অন্তত ১০ লাখ পর্যটক কক্সবাজার ভ্রমণ করেছেন। এখনো লাখো পর্যটক সেখানে অবস্থান করছেন। পর্যটকদের ব্যবহৃত প্লাস্টিক বর্জ্য সাগরদূষণের অন্যতম কারণ হয়ে উঠছে। তাই যেখানে-সেখানে প্লাস্টিক বর্জ্য না ফেলার বিষয়ে সচেতনতা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ‘বর্জ্যমানব’দের মাধ্যমে পর্যটকদের কাছে পরিবেশ রক্ষার বার্তা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়েছে বলেও জানান তিনি।
ডাস্টবিন থাকলেও কমছে না বর্জ্য
সৈকতের বিভিন্ন স্থানে বর্জ্য ফেলার জন্য ডাস্টবিন রাখা হলেও অনেক পর্যটক তা ব্যবহার করেন না। ফলে বালুচরে পড়ে থাকছে প্লাস্টিকের বোতল, খাবারের প্যাকেটসহ নানা ধরনের বর্জ্য। পরে বাতাস ও ঢেউয়ের সঙ্গে এসব বর্জ্য ছড়িয়ে পড়তে পারে সৈকত ও সমুদ্রের পানিতে। এতে একদিকে যেমন সৈকতের সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে সামুদ্রিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যও হুমকির মুখে পড়ছে।
বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের পরিচালক জামাল উদ্দিন বলেন, সৈকতে বেড়াতে এসে অনেকেই বালুচরে ময়লা-আবর্জনা ফেলে রাখেন। বিশেষ করে প্লাস্টিক বর্জ্য সমুদ্রের পানিতে ছড়িয়ে দূষণ সৃষ্টি করছে। প্লাস্টিক বর্জ্য পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর কতটা ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে, তা মানুষের সামনে তুলে ধরতেই ১২ জন নারী-পুরুষকে ‘বর্জ্যমানব’ হিসেবে সাজানো হয়েছে।
বর্জ্য দিয়ে তৈরি ৫০ ফুটের ভাস্কর্য
কক্সবাজার সৈকত পরিষ্কার রাখা ও প্লাস্টিকদূষণ নিয়ে সচেতনতা তৈরিতে বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের এটি প্রথম উদ্যোগ নয়। এর আগে গত ১২ অক্টোবর সৈকতের সুগন্ধা পয়েন্টে বর্জ্য দিয়ে তৈরি ৫০ ফুট উচ্চতার একটি ভাস্কর্য উদ্বোধন করা হয়। সৈকতের বালিয়াড়িতে স্থাপন করা এ ভাস্কর্য দেখতে প্রতিদিন ভিড় করছেন বহু মানুষ।
বর্জ্য দিয়ে তৈরি ভাস্কর্য ও ‘বর্জ্যমানব’- দুটি উদ্যোগের মাধ্যমেই প্লাস্টিকদূষণের ভয়াবহতা দৃশ্যমানভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে ফাউন্ডেশনটি।
পরিবেশ রক্ষায় দায়িত্ব পর্যটকদেরও
কক্সবাজারের পর্যটনশিল্পের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ এর বিশাল সমুদ্রসৈকত ও প্রাকৃতিক পরিবেশ। পর্যটকের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সৈকতের পরিচ্ছন্নতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং সামুদ্রিক পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্লাস্টিক বর্জ্য যথাযথভাবে সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনা করা না হলে তা সমুদ্রে ছড়িয়ে পড়ে সামুদ্রিক প্রাণীর ক্ষতির কারণ হতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে শুধু প্রচারণা নয়, প্রয়োজন পর্যটকদের সচেতন আচরণ, পর্যাপ্ত বর্জ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা এবং নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম। ডাস্টবিন ব্যবহার, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো এবং নির্দিষ্ট স্থানে বর্জ্য ফেলার অভ্যাস গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন পরিবেশসচেতনতামূলক কার্যক্রমের উদ্যোক্তারা।
কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় প্রশাসন, পর্যটন ব্যবসায়ী, স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকদের সম্মিলিত উদ্যোগ জরুরি। সৈকতে ১২ ‘বর্জ্যমানব’-এর ব্যতিক্রমী উপস্থিতি যেন সেই বার্তাই দিচ্ছে, সৈকতের সৌন্দর্য উপভোগ করার পাশাপাশি তা পরিচ্ছন্ন রাখার দায়িত্বও সবার।
আরু|



