তুরস্কের উপকূলে ভূমধ্যসাগরের তলদেশে প্রায় ৪ হাজার ৭০০ বছরের পুরনো একটি জাহাজের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কার করেছেন প্রত্নতত্ত্ববিদরা। তাঁদের ধারণা, এটি বিশ্বের এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত সবচেয়ে প্রাচীন জাহাজের ধ্বংসাবশেষ। প্রায় সাড়ে চার হাজার বছর ধরে সমুদ্রের তলদেশে পড়ে থাকা এই জাহাজের কাঠামো বিলীন হয়ে গেলেও এর বহন করা মাটির পাত্র ও পাথরের নোঙর এখনো ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী হয়ে রয়েছে।
বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, তুরস্কের দক্ষিণাঞ্চলীয় আনতালিয়া প্রদেশের কেকোভা দ্বীপের কাছাকাছি ভূমধ্যসাগরের প্রায় ৩০ মিটার গভীরে জাহাজটির ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে।
প্রত্নতত্ত্ববিদদের ধারণা, জাহাজটি প্রায় ৪ হাজার ৪০০ থেকে ৪ হাজার ৭০০ বছর আগে ডুবে যায়। সময়টি ছিল ব্রোঞ্জ যুগের শুরুর দিকের, যখন প্রাচীন মিসরে গিজার গ্রেট পিরামিড নির্মাণের কাজ চলছিল।
জাহাজটির দৈর্ঘ্য ছিল আনুমানিক ১০ মিটার বা ৩৩ ফুট। এটি ভূমধ্যসাগরের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে পণ্য পরিবহনে ব্যবহৃত একটি বাণিজ্যিক জাহাজ ছিল বলে মনে করছেন গবেষকরা। সমুদ্রের তলদেশে ঢালু জায়গাজুড়ে এর বহন করা পণ্য ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল।
উদ্ধার করা নিদর্শনের মধ্যে রয়েছে তিনটি বড় পাথরের নোঙর এবং ৩০টির বেশি সিরামিকের পাত্র। এসব পাত্রকে অ্যাম্ফোরা বলা হয়। এগুলো প্রাচীনকালে বিভিন্ন পণ্য সংরক্ষণ ও পরিবহনে ব্যবহার করা হতো। জাহাজের কাঠের কোনো অংশ অবশিষ্ট না থাকায় কার্বন-১৪ পদ্ধতিতে এর বয়স নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি।
তাই প্রত্নতত্ত্ববিদরা পাত্রগুলোর আকৃতি, নকশা ও তৈরির কৌশল বিশ্লেষণ করে জাহাজটির বয়স নির্ধারণ করেছেন। পাত্রগুলোর দুই পাশে হাতল, মাঝখানে উঁচু অংশ এবং সমতল তলদেশ রয়েছে। এসব বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মিসর ও মধ্যপ্রাচ্যে পাওয়া প্রায় ৪ হাজার ৪০০ থেকে ৪ হাজার ৭০০ বছরের পুরনো পাত্রের মিল রয়েছে।
আকদেনিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হাকান ওনিজের নেতৃত্বে ভূমধ্যসাগরীয় প্রত্নতত্ত্ব সমিতির একটি দল এই অনুসন্ধান চালায়। অধ্যাপক ওনিজের মতে, পাত্রগুলোর নকশা ও তৈরির কৌশল বিশ্লেষণ করে এগুলোকে প্রাথমিক ব্রোঞ্জ যুগের বলে শনাক্ত করা গেছে।
গবেষকদের ধারণা, জাহাজটি পূর্ব ভূমধ্যসাগরের উপকূলীয় কোনো বন্দর থেকে যাত্রা শুরু করেছিল। বর্তমান সিরিয়া, লেবানন, ইসরায়েল কিংবা গাজার উপকূলীয় অঞ্চল থেকে এটি পণ্য নিয়ে যাত্রা করে থাকতে পারে।
এর সম্ভাব্য গন্তব্য ছিল বর্তমান তুরস্কের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত প্রাচীন ট্রয় নগরী অথবা গ্রিসের ক্রিট দ্বীপ, যেখানে মিনোয়ান সভ্যতার বিকাশ ঘটেছিল। তবে জাহাজটির সুনির্দিষ্ট যাত্রাপথ ও গন্তব্য এখনো নিশ্চিত নয়।
উদ্ধার করা পাত্রগুলোর কয়েকটির ভেতরে চকচকে ও আঠালো পদার্থের অবশিষ্টাংশ পাওয়া গেছে। অস্ট্রেলিয়ার ম্যাকুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ববিদ ড. কারিন সোয়াদা পাত্রগুলোর ভেতরে এত বেশি অবশিষ্টাংশ দেখে বিস্ময় প্রকাশ করেন।
তাঁর মতে, এসব পদার্থ জলপাইয়ের তেল, মদ কিংবা গাছের রজন হতে পারে। তবে এগুলোর প্রকৃত পরিচয় এখনো নিশ্চিত হয়নি। পাত্রগুলো একাধিকবার ব্যবহারের ফলে এমন অবশিষ্টাংশ তৈরি হয়ে থাকতে পারে বলেও মনে করছেন গবেষকরা।
একটি পাত্রে নয়টি প্রতীকের মতো চিহ্ন এবং দুটি ছিদ্র পাওয়া গেছে। এটি পনির বা মাখন তৈরিতে ব্যবহৃত হতো কি না, তা-ও পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে।
জাহাজটির ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কারের আগে গ্রিসের ডোকোস দ্বীপের কাছে পাওয়া প্রায় ৪ হাজার ২০০ বছরের পুরনো একটি জাহাজের ধ্বংসাবশেষকে প্রাচীনতম নিদর্শনগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হতো। নতুন আবিষ্কারটি সেই রেকর্ডকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। তবে কাঠের কাঠামোর কিছু অংশ টিকে থাকা সবচেয়ে পুরনো জাহাজের ধ্বংসাবশেষের মধ্যে রয়েছে বুলগেরিয়ার কৃষ্ণসাগর উপকূলে পাওয়া প্রায় ২ হাজার ৪০০ বছরের পুরনো একটি নিদর্শন।
কেকোভা দ্বীপের আশপাশে প্রবল স্রোত ও বাতাসের কারণে প্রাচীনকাল থেকেই বহু জাহাজ ডুবে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। সমুদ্রের প্রায় ৩০ মিটার গভীরতায় কাজ করার কারণে ডুবুরিরা একেকবার মাত্র ৩০ মিনিট করে অনুসন্ধান চালাতে পেরেছেন। উদ্ধার করা ভঙ্গুর পাত্রগুলো বর্তমানে সতর্কতার সঙ্গে সংরক্ষণ ও পরীক্ষা করা হচ্ছে। তুরস্কের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে এসব নিদর্শন আনতালিয়ায় প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হবে।
অধ্যাপক হাকান ওনিজ এই আবিষ্কারকে সমুদ্রের তলদেশে থাকা একটি ‘টাইম ক্যাপসুল’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, এই জাহাজের ধ্বংসাবশেষ শুধু প্রাচীন বাণিজ্যের ইতিহাসই নয়, বরং সেই সময়ের নাবিক, পণ্য উৎপাদক এবং তাঁদের পরিবারের জীবন সম্পর্কেও নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করেছে।
প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগের এই আবিষ্কার প্রমাণ করছে, আধুনিক নৌযান ও যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে ওঠার বহু আগেই ভূমধ্যসাগরজুড়ে পণ্য পরিবহন এবং বিভিন্ন সভ্যতার মধ্যে বাণিজ্যিক যোগাযোগ চালু ছিল। উদ্ধার করা পাত্রগুলোর ভেতরে থাকা অবশিষ্টাংশের বিশ্লেষণ শেষ হলে প্রাচীন মানুষের বাণিজ্য, খাদ্যাভ্যাস ও দৈনন্দিন জীবন সম্পর্কে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে আসতে পারে।
আরু|



