আজ ২৪ আগস্ট ইয়াসমিন হত্যা দিবস, একই সঙ্গে নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস। নারী ও শিশুদের ওপর সহিংসতা বন্ধে সচেতনতা তৈরির প্রত্যয়ে প্রতিবছর দিনটি পালিত হয়। তবে দিবসটি সামনে রেখে প্রকাশিত সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, গত বছর পুরো ১২ মাসে দেশে ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছিলেন ৫৫ জন। অথচ চলতি বছরের প্রথম সাত মাসেই এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৮ জনে। মাসিক গড় হিসাব করলে গত বছরের তুলনায় এ ধরনের অপরাধের হার বেড়েছে প্রায় ৮১ শতাংশ।
১৯৯৫ সালের ২৪ আগস্ট দিনাজপুরের কিশোরী ইয়াসমিন পুলিশ সদস্যদের দ্বারা ধর্ষণ ও নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। এ ঘটনার প্রতিবাদে তীব্র আন্দোলন গড়ে ওঠে। আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশের গুলিতে কয়েকজন নিহত হন। পরে ইয়াসমিন হত্যার প্রতিবাদ দেশব্যাপী নারী অধিকার আন্দোলনের অন্যতম প্রতীকে পরিণত হয়। সেই থেকে দিনটি নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।
ঘটনার ৩১ বছর পেরিয়ে গেলেও নারী ও শিশুদের ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা থামেনি। সম্প্রতি মাদারীপুরের শিবচরে ২৮ বছর বয়সী এক নারীকে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগে ফারুক নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পুলিশের কাছে দেওয়া স্বীকারোক্তিতে তিনি ধর্ষণের পর ওই নারীকে হত্যা করে মরদেহ ঝোপের পাশে ফেলে রাখার কথা জানান। একই সঙ্গে তার এক বছর বয়সী শিশুপুত্রকে আড়িয়াল খাঁ নদীতে ফেলে হত্যার কথাও স্বীকার করেন।
মানবাধিকারকর্মীদের মতে, অনেক ক্ষেত্রে অপরাধের প্রমাণ মুছে ফেলা, ভুক্তভোগীকে চুপ করিয়ে দেওয়া কিংবা পরিচয় প্রকাশের ভয় থেকেই ধর্ষণের পর হত্যার মতো ঘটনা ঘটে।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, এ ধরনের নৃশংস ঘটনা সমাজে গভীর উদ্বেগ ও মানসিক আঘাত তৈরি করছে। তার মতে, সামাজিক অস্থিরতা, মাদকের বিস্তার এবং অপরাধের যথাযথ বিচার না হওয়া এসব ঘটনার অন্যতম কারণ।
আসকের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে দেশে ৭৪৯টি ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়। এর মধ্যে ৫৬৯টি ছিল একক ধর্ষণ এবং ১৮০টি সংঘবদ্ধ ধর্ষণ। গত পাঁচ বছরে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা ঘটেছে ২০২টি। উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব ঘটনার বড় একটি অংশেই শিশু ভুক্তভোগী।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্যমতে, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে ১০ জন নারী ও ২১ জন শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে।
ধর্ষণের পর হত্যার আলোচিত ঘটনাগুলোর মধ্যে চলতি বছরের মার্চে মিরপুরে এক শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি করে। এর আগে গত বছর মাগুরায় আট বছর বয়সী এক শিশুকে তার বোনের শ্বশুর ধর্ষণ ও হত্যা করেন বলে অভিযোগ ওঠে।
‘আমরাই পারি’ পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ জোটের প্রধান নির্বাহী জিনাত আরা হক বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতনের বিচার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা কমানো জরুরি। প্রতিটি ঘটনা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত, দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের কার্যকারিতা বাড়ানো এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। পাশাপাশি নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা ১৮০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়ার কথাও বলেন।
তার মতে, শুধু আইন প্রণয়ন করলেই হবে না; ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা, চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তাও নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে নির্ভুল আলামত সংগ্রহ, সাক্ষীর নিরাপত্তা এবং নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করা জরুরি।
অ্যাডভোকেট সুলতানা কামালের মতে, ধর্ষণবিরোধী আইন শক্তিশালী হলেও অভিযোগ প্রমাণের ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী নানা প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়েন। পুলিশ, চিকিৎসকসহ সংশ্লিষ্ট সবার যথাযথ সহযোগিতা না থাকলে বিচার পাওয়ার পথ কঠিন হয়ে যায়। পাশাপাশি নারীর প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন এবং বিচারব্যবস্থায় নারীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি তুলে ধরেন।
ধর্ষণের পর হত্যা বন্ধে প্রাথমিক পর্যায়েই অভিযোগ গ্রহণ, দ্রুত মেডিক্যাল পরীক্ষা, ডিএনএ ও অন্যান্য ফরেনসিক আলামত সংরক্ষণ এবং ভুক্তভোগী ও সাক্ষীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ এবং আইন কমিশনের মুখ্য গবেষণা কর্মকর্তা ফউজুল আজিম। শিশুদের জন্য সহায়ক জিজ্ঞাসাবাদ ব্যবস্থা এবং মামলার দ্রুত ও কার্যকর নিষ্পত্তির প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আইন প্রয়োগের পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজে যৌন সহিংসতা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হবে। শিশুদের বয়সোপযোগীভাবে নিরাপদ ও অনিরাপদ আচরণ সম্পর্কে শিক্ষা দিতে হবে। কোনো যৌন হয়রানি বা নির্যাতনের অভিযোগ উঠলে ‘পারিবারিক সম্মান’ রক্ষার নামে তা গোপন না করে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।
ইয়াসমিন হত্যার ৩১ বছর পরও যদি ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা বাড়তে থাকে, তাহলে শুধু একটি দিবস পালন নয় নারী ও শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিচার, আইন প্রয়োগ এবং সামাজিক সচেতনতার কার্যকর সমন্বয় এখন সময়ের দাবি।
আরু|



