৬৬ বছর আগে করা এক ভবিষ্যদ্বাণী ঘিরে আবারও শুরু হয়েছে আলোচনা। দাবি করা হয়েছিল, ২০২৬ সালের ১৩ নভেম্বর ধ্বংস হয়ে যাবে পৃথিবী! সেই তারিখ যত ঘনিয়ে আসছে, ততই সামনে আসছে পুরোনো গবেষণাপত্রের বিষয়টি। তবে বিজ্ঞানীদের বিশ্লেষণ বলছে, এই ভবিষ্যদ্বাণীর সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই। এটি মূলত জনসংখ্যা বৃদ্ধির একটি গাণিতিক পূর্বাভাসের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছিল।
১৯৬০ সালে বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সায়েন্স’-এ প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে এমন আশঙ্কার কথা তুলে ধরেন অস্ট্রিয়ান বংশোদ্ভূত মার্কিন অধ্যাপক ও সাইবারনেটিকস বিশেষজ্ঞ হাইঞ্জ ফন ফোরস্টার এবং তার দুই শিক্ষার্থী প্যাট্রিসিয়া এম মোরা ও লরেন্স ডব্লিউ আমিট।
গবেষণায় গত দুই হাজার বছরের জনমিতিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে তারা দেখান, বিশ্বে জনসংখ্যা বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকলে একপর্যায়ে তা প্রায় অসীম সংখ্যায় পৌঁছাতে পারে। অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপে মানবজাতির অস্তিত্ব ভয়াবহ সংকটে পড়বে বলেও পূর্বাভাস দেন তারা। তাদের গাণিতিক হিসাব অনুযায়ী, সেই ভয়াবহ পরিস্থিতির সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল ২০২৬ সালের ১৩ নভেম্বর।
ষাটের দশকে গবেষণাটি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। এমনকি ‘টাইম’ ও ‘নিউইয়র্ক টাইমস’-এর মতো প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যমেও জায়গা করে নেয় এই তত্ত্ব। বিভিন্ন জিনগত, বাস্তুসংস্থান ও জনমিতিবিষয়ক পাঠ্যবইয়েও অন্তর্ভুক্ত হয় গবেষণাটি। তবে শুরু থেকেই গণিতবিদ ও জনসংখ্যাবিদদের একাংশ এর সমালোচনা করেন।
অবশ্য পরবর্তী সময়ে ১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হিসাবের ক্ষেত্রে গবেষকদের সমীকরণ বেশ কার্যকর বলেও মনে হয়েছিল। এমনকি ১৯৬৩ সালে কানাডার সংসদীয় কমিটি এবং ১৯৭১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের একটি গর্ভপাত-সংক্রান্ত মামলাতেও এই গবেষণার উল্লেখ করা হয়।
কিন্তু নব্বইয়ের দশকে এসে বদলে যেতে থাকে পরিস্থিতি। ১৯৯৩ সালের দিকে বিশ্বজুড়ে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার গবেষকদের পূর্বাভাসের নির্ধারিত রেখার নিচে নেমে যায়। ফলে তাদের গাণিতিক হিসাব আর বাস্তবতার সঙ্গে মিলছিল না।
গবেষণাপত্রে বিশ্বজুড়ে জন্মহার অর্ধেকে নামিয়ে আনার আহ্বানও জানানো হয়েছিল। বর্তমানে বিশ্বে জন্মহার ১৯৬০ সালের তুলনায় অর্ধেকেরও কিছুটা কম। কানাডার ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক অ্যালান ম্যাকইচার্ন এই গবেষণার সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে দেখিয়েছেন, জনসংখ্যা বৃদ্ধির বাস্তব প্রবণতা যথাযথভাবে বিবেচনায় নিতে পারেনি ওই তত্ত্ব।
এদিকে ষাটের দশকে পৃথিবী ধ্বংসের আরও কিছু ভবিষ্যদ্বাণী আলোচনায় এসেছিল। মার্কিন বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মী ও ইউএফও গবেষক চ্যান থমাস তার ‘দ্য অ্যাডাম অ্যান্ড ইভ স্টোরি’ বইয়ে পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তনের আশঙ্কা প্রকাশ করেন। তার দাবি ছিল, প্রতি ছয় হাজার বছর পরপর পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন ঘটে, যা একপর্যায়ে ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। বইটি দীর্ঘদিন মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর গোপন নথির অন্তর্ভুক্ত ছিল। পরে ২০১৩ সালে বই-সংক্রান্ত নথি প্রকাশ করা হয়।
সব মিলিয়ে, ১৩ নভেম্বর পৃথিবী ধ্বংস হওয়ার যে ভবিষ্যদ্বাণী ছড়িয়ে পড়েছে, তার পেছনে রয়েছে ১৯৬০ সালের একটি জনসংখ্যাবিষয়ক গাণিতিক গবেষণা। কিন্তু পরবর্তী কয়েক দশকের বাস্তব তথ্যই দেখিয়েছে, সেই হিসাব সঠিক ছিল না। তাই ১৩ নভেম্বর পৃথিবী ধ্বংস হওয়ার দাবির কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
আরু|



