এক কোটি টাকা ঘুষ চাওয়ার অভিযোগে আলোচনায় আসা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক প্রসিকিউটর সাইমুম রেজা তালুকদার দেশ ছেড়েছেন। গত ৩১ অক্টোবর তিনি ইতালি গেছেন বলে জানা গেছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার এক আসামিকে জামিনে মুক্তি পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে তার পরিবারের কাছে এক কোটি টাকা ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ উঠেছিল তার বিরুদ্ধে।
তবে অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত চলমান থাকলেও সাইমুম রেজার বিদেশযাত্রায় কোনো নিষেধাজ্ঞা ছিল না বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম।
মঙ্গলবার ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে এক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সাইমুম রেজার বিদেশ ভ্রমণে কোনো নিষেধাজ্ঞা ছিল না। ফলে তিনি কোথায় যাবেন, সে বিষয়ে চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ের কিছু করার নেই।
সাংবাদিকেরা জানতে চান, কোটি টাকা ঘুষ চাওয়ার অভিযোগে পদত্যাগ করা সাবেক এই প্রসিকিউটর ৩১ অক্টোবর ইতালি চলে গেছেন। তার বিরুদ্ধে গঠিত ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি আট মাসেও প্রতিবেদন দিতে পারেনি, নাকি তাকে বিদেশে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে?
জবাবে আমিনুল ইসলাম বলেন, এর কোনোটিই নয়। ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির তদন্ত কার্যক্রম চলছে এবং তা শেষ পর্যায়ে রয়েছে। প্রতিবেদন পাওয়ার অপেক্ষায় আছেন তারা।
তিনি জানান, ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ ওঠার পর সাইমুম রেজার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী তিনি পদত্যাগ করেন। তবে তার বিদেশযাত্রায় কোনো বাধা ছিল না।
আট মাসেও কেন বিষয়টি ফৌজদারি প্রক্রিয়ায় নেওয়া হয়নি, এমন প্রশ্নের জবাবে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ঘুষ চাওয়া ও দেওয়া—দুটিই অপরাধ। যারা সাইমুমকে ঘুষ দেওয়ার প্রস্তাব করেছিলেন, তারাও সমভাবে দায়ী। তদন্ত কমিটির একজন সদস্য দীর্ঘদিন অসুস্থ ছিলেন। তিনি নিজেও কিছুদিন বিদেশে ছিলেন। পাশাপাশি অন্য এক প্রসিকিউটরের মায়ের মৃত্যুতে তিনিও দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। এসব কারণে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে দেরি হয়েছে। দ্রুত প্রতিবেদন দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
যেভাবে সামনে আসে এক কোটি টাকা ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় চট্টগ্রামে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় গ্রেপ্তার হন সাবেক সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরী। তাকে জামিনে মুক্ত করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে পরিবারের কাছে এক কোটি টাকা চাওয়ার অভিযোগ ওঠে তৎকালীন প্রসিকিউটর সাইমুম রেজা তালুকদারের বিরুদ্ধে।
গত ৯ মার্চ রাতে বেসরকারি একটি টেলিভিশন চ্যানেল ফজলে করিমের স্ত্রী ও সাইমুম রেজার কথোপকথনের একটি অডিও প্রকাশ করে। সেখানে কিস্তিতে টাকা পরিশোধের আলোচনা এবং মামলা থেকে অব্যাহতির নিশ্চয়তা পেতে বিএনপির এক সংসদ সদস্য ও এক প্রতিমন্ত্রীর মাধ্যমে তদবির করানোর পরামর্শ শোনা যায়। এমনকি ট্রাইব্যুনালের নতুন চিফ প্রসিকিউটরের সমর্থন আদায়েও ওই রাজনৈতিক নেতাদের সুপারিশ কাজে লাগবে বলে কথোপকথনে উল্লেখ করা হয়।
অডিও প্রকাশের পর অভিযোগ অস্বীকার করেন সাইমুম রেজা। নিজের ফেসবুক পোস্টে তিনি দাবি করেন, এটি একটি মহলের অপপ্রচার এবং অডিওগুলো মিথ্যা।
এরই মধ্যে গত ৯ মার্চ ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেন তিনি। একই দিন ঘটনাটি তদন্তে পাঁচ সদস্যের ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি গঠন করে চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়। কমিটির প্রধান করা হয় চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলামকে।
পরে গত ২১ এপ্রিল চিফ প্রসিকিউটর জানান, ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি সাইমুম রেজা ও ফজলে করিমের স্ত্রীর কথোপকথনের অডিওর সত্যতা পেয়েছে। তবে তাদের মধ্যে এর বাইরে কোনো আর্থিক লেনদেন হয়েছিল কি না, তা তখনও খতিয়ে দেখা হচ্ছিল। তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পর আইন মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়ার কথাও জানিয়েছিলেন তিনি।
ট্রাইব্যুনালে যোগদান ও পদত্যাগ
২০২৪ সালের ৮ অক্টোবর পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর হিসেবে যোগ দেন সাইমুম রেজা তালুকদার। রামপুরা, লক্ষ্মীপুর ও ময়মনসিংহসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের কয়েকটি মামলা পরিচালনা করেন তিনি। প্রসিকিউটর হওয়ার আগে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্যেষ্ঠ প্রভাষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন এই আইনজীবী।
গত ৯ মার্চ ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগের কথা নিশ্চিত করে সাইমুম জানান, কয়েক দিন আগেই অব্যাহতি চেয়ে আবেদন করেছিলেন। সেদিনই ছিল তার শেষ কর্মদিবস। আগের পেশায় ফিরে যাওয়ার জন্য তিনি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানান। তার পদত্যাগপত্র আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠান চিফ প্রসিকিউটর।
অন্যদিকে, সাবেক সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীকে ২০২৫ সালের ১২ সেপ্টেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালানোর চেষ্টাকালে গ্রেপ্তারের তথ্য জানায় পুলিশ। পরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে ঘিরে সংঘটিত গণহত্যার মামলায় গত ১৬ ফেব্রুয়ারি তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
প্রসিকিউশনের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে চট্টগ্রামে ওয়াসিমসহ ৯ জন নিহত এবং ৪৫৯ জন আহত হওয়ার ঘটনায় ফজলে করিমের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।
এক কোটি টাকা ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ, অডিওর সত্যতা পাওয়ার তথ্য এবং আট মাসেও তদন্ত প্রতিবেদন চূড়ান্ত না হওয়া সবকিছুর মধ্যেই সাবেক এই প্রসিকিউটরের ইতালি যাত্রা নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এখন তদন্ত কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদনের দিকেই নজর সংশ্লিষ্টদের।
আরু|



