সমুদ্রপথে বিশ্বভ্রমণের স্বপ্ন নিয়ে নিউজিল্যান্ড থেকে বাংলাদেশে এসেছিলেন জন এডওয়ার্ড পুদন। স্ত্রী বেলা ও দুই ছেলে আলবার্ট এবং রালফকে নিয়ে কক্সবাজারে তৈরি করেছিলেন বিশেষ নৌযান ‘আইল্যান্ড গার্ল’। পরিকল্পনা ছিল, নিজেদের নৌযানে চড়ে এক দেশ থেকে অন্য দেশে ঘুরে বেড়াবেন। দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রা শেষে ফিরবেন নিজ দেশে। কিন্তু সেই স্বপ্নযাত্রা শেষ হয়েছে এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায়। গত ২৫ আগস্ট মহেশখালী চ্যানেলের মোহনায় বড় ঢেউ ও তীব্র স্রোতে ডুবে যায় ‘আইল্যান্ড গার্ল’। সাগরে পড়ে যাওয়া পরিবারের চার সদস্যের মধ্যে তিনজনকে জীবিত উদ্ধার করা হলেও নিখোঁজ হয় ১৬ বছর বয়সী বড় ছেলে আলবার্ট। পরদিন তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
সন্তান হারানোর শোক নিয়ে প্রায় দেড় মাস কক্সবাজারে অবস্থানের পর অবশেষে নিউজিল্যান্ডে ফিরছেন জন এডওয়ার্ড, তাঁর স্ত্রী বেলা ও ছোট ছেলে রালফ।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) তাঁদের আকাশপথে দেশে ফেরার কথা রয়েছে। যে নৌযানকে ঘিরে ছিল বিশ্বভ্রমণের স্বপ্ন, সেটিকে পেছনে ফেলে এবার বিমানে চড়েই দেশে ফিরতে হচ্ছে পরিবারটিকে।
কক্সবাজারে তৈরি হয়েছিল স্বপ্নের নৌযান
জন এডওয়ার্ড ২০২৪ সালে পর্যটক ভিসায় বাংলাদেশে আসেন। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সমুদ্রপথে পৃথিবী ঘুরে দেখার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য বেছে নেন কক্সবাজারকে। স্থানীয় কারিগরদের সহযোগিতায় শহরের এসএমপাড়া এলাকায় তৈরি করা হয় ‘আইল্যান্ড গার্ল’।
নাজিরারটেকের বাসিন্দা দিসরুল ইসলাম রুবেলের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় দুই বছর ধরে নৌযানটির নির্মাণকাজ চলে। এতে অন্তত এক কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে বলে দাবি তাঁর।
দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার উপযোগী করে তৈরি নৌযানটিতে ছিল শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কক্ষ, ফ্রিজ ও রান্নাঘরসহ নানা সুবিধা। পরিবার নিয়ে এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সব আয়োজন করেছিলেন জন এডওয়ার্ড।
কিন্তু সেই স্বপ্নের নৌযানই শেষ পর্যন্ত হয়ে ওঠে তাঁদের জীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক ঘটনার সাক্ষী।
যেভাবে ঘটে নৌকাডুবি
কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনীম জাহানের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন সকালে ‘আইল্যান্ড গার্ল’ নিয়ে চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা হয় পরিবারটি। নাজিরারটেক থেকে কিছু দূরে মহেশখালী চ্যানেলের মোহনায় সকাল সাড়ে ৯টার দিকে বড় ঢেউ ও তীব্র স্রোতের কবলে পড়ে নৌযানটি। একপর্যায়ে পরিবারের চার সদস্যই সাগরে পড়ে যান।
কাছাকাছি থাকা স্থানীয় জেলেরা দ্রুত এগিয়ে এসে জন এডওয়ার্ড, বেলা ও ছোট ছেলে রালফকে উদ্ধার করেন। তবে নিখোঁজ থেকে যায় বড় ছেলে আলবার্ট।
খবর পেয়ে উদ্ধারকাজে যোগ দেয় কোস্ট গার্ড, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, লাইফগার্ড ও স্থানীয় জেলেরা। সাগর ও উপকূলজুড়ে তল্লাশি চালানোর পরদিন বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে সমিতিপাড়া উপকূলে একটি মরদেহ ভাসতে দেখেন স্থানীয় লোকজন। পরে সেটি আলবার্টের বলে শনাক্ত করা হয়।
কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শেখ মোহাম্মদ আলী জানান, মরদেহ উদ্ধারের পর আইনগত প্রক্রিয়া ও ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করা হয়। পরে পুলিশের উপস্থিতিতে কক্সবাজারের একটি শ্মশানে আলবার্টের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। এ জন্য নিউজিল্যান্ডের দূতাবাস ও পরিবারের অনুমতি নেওয়া হয়েছিল।
দেড় মাসের অপেক্ষা, এবার দেশে ফেরা
নৌকাডুবির পর জন এডওয়ার্ড, বেলা ও রালফকে কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে রাখা হয়। তাঁদের আশ্রয় দেওয়া হয়েছিল বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের মোটেল শৈবালে। নিরাপত্তার জন্য সেখানে পুলিশও মোতায়েন ছিল।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেলের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাহমুদুর রহমান জানান, পরিবারের তিন সদস্যের দেশে ফেরার প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে শুক্রবার তাঁরা নিউজিল্যান্ডের উদ্দেশে রওনা হবেন।
নৌকাডুবির সময় তাঁদের পাসপোর্টসহ প্রয়োজনীয় কিছু নথি হারিয়ে যায়। এতে দেশে ফেরার প্রক্রিয়া জটিল হয়ে পড়ে। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনীম জাহান জানান, বাংলাদেশে নিউজিল্যান্ডের কোনো দূতাবাস না থাকায় শ্রীলঙ্কায় অবস্থিত দেশটির দূতাবাসের সঙ্গে অনলাইন ও ভার্চ্যুয়াল যোগাযোগের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
নৌকাডুবির পর উদ্ধার হওয়া পরিবারের সদস্যদের প্রথমে কোস্ট গার্ডের কক্সবাজার স্টেশনে নেওয়া হয়। পরে তাঁদের দেখভালের দায়িত্ব নেয় জেলা প্রশাসন। নৌযান থেকে উদ্ধার করা কিছু জিনিসপত্র পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত ‘আইল্যান্ড গার্ল’ এখনো কোস্ট গার্ডের হেফাজতে রয়েছে।
এর আগেও বিপদে পড়েছিল পরিবারটি
পরিবারটির সমুদ্রযাত্রা নিয়ে আগে থেকেই উদ্বেগ ছিল বলে জানিয়েছে কোস্ট গার্ড। কোস্ট গার্ড পূর্ব জোনের গণমাধ্যম কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজনের ভাষ্য অনুযায়ী, নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি বিবেচনায় পরিবারটিকে সমুদ্রযাত্রা থেকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছিল। গত ১ মার্চ তাঁদের প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নির্দেশনাও দেওয়া হয়।
তিনি জানান, এপ্রিল মাসে বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে মহেশখালী চ্যানেল অতিক্রমের সময় ‘আইল্যান্ড গার্ল’ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে পরিবারটি সোনাদিয়ায় আশ্রয় নিলে রাতে দুর্বৃত্তরা তাঁদের ওপর হামলা চালায়। এ সময় অর্থ, মুঠোফোন, পাসপোর্ট, পোশাকসহ বিভিন্ন মালামাল লুট করা হয়।
১০ এপ্রিল কোস্ট গার্ড পরিবারটিকে উদ্ধার করে। অভিযান চালিয়ে অধিকাংশ মালামালও উদ্ধার করা হয়। পরে নৌযানটি ডকইয়ার্ডে নিয়ে মেরামত করা হয়েছিল। এরপর আবারও সমুদ্রযাত্রা শুরু করে পরিবারটি।
কিন্তু ২৫ আগস্টের দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাতে হয় আলবার্টকে। থেমে যায় চার সদস্যের পরিবারকে নিয়ে বিশ্বভ্রমণের স্বপ্ন।
বাঁকখালী নদীতে পড়ে আছে ‘আইল্যান্ড গার্ল’
স্থানীয় জেলে আবদুর রহমানের ভাষ্য অনুযায়ী, দুটি কাঠের নৌযান জোড়া দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল ‘আইল্যান্ড গার্ল’। বড় ঢেউয়ের ধাক্কায় নৌযানটির সংযোগস্থল বিচ্ছিন্ন হয়ে একটি অংশ দ্রুত ডুবে যায়। কয়েক মিনিটের মধ্যে অন্য অংশটিও তলিয়ে যায়।
বর্তমানে নুনিয়াছড়ার বিআইডব্লিউটিএ জেটির বিপরীতে বাঁকখালী নদীতে ডুবন্ত অবস্থায় পড়ে আছে নৌযানটি।
যে ‘আইল্যান্ড গার্ল’কে ঘিরে জন এডওয়ার্ডের পরিবারের বিশ্বভ্রমণের স্বপ্ন বোনা হয়েছিল, সেটিই এখন তাঁদের কাছে এক অপূর্ণ স্বপ্নের স্মারক। সন্তান হারানোর গভীর শোক বুকে নিয়ে দেশে ফিরছেন পরিবারের তিন সদস্য। আর বাঁকখালী নদীতে পড়ে থাকা নৌযানটি নীরবে মনে করিয়ে দিচ্ছে তাঁদের সেই অসমাপ্ত সমুদ্রযাত্রার গল্প।
আরু|



