ঢাকের বাদ্য, কাঁসরের ধ্বনি আর চণ্ডীপাঠে মুখরিত দেশের পূজামণ্ডপ। মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। উৎসবের আনন্দে মেতেছেন ভক্তরা। অন্যদিকে, পূজাকে নির্বিঘ্ন ও শান্তিপূর্ণ রাখতে সারা দেশে জোরদার করা হয়েছে নিরাপত্তাব্যবস্থা।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে পাঁচ দিনের শারদীয় দুর্গোৎসব। আগামী বুধবার (২১ অক্টোবর) বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এবারের উৎসব।
পঞ্জিকা অনুযায়ী, মহাষষ্ঠীতে দেবী দুর্গার বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাসের মধ্য দিয়ে শুরু হয় মূল আনুষ্ঠানিকতা। সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাস অনুসারে, অসুর শক্তির বিনাশ এবং শুভ শক্তির প্রতিষ্ঠার প্রতীক দেবী দুর্গা। প্রতিবছরের মতো এবারও দেবীকে বরণ করে নিতে দেশের বিভিন্ন মন্দির ও পূজামণ্ডপ সাজানো হয়েছে বর্ণিল আলোকসজ্জা ও নানা আয়োজনে।
সারা দেশে ৩৩ হাজার ৮৫১ মণ্ডপে পূজা
বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদ ও মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির তথ্য অনুযায়ী, এবার সারা দেশে ৩৩ হাজার ৮৫১টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ৩২ হাজার ৩৫১টি। অর্থাৎ, গত বছরের তুলনায় এবার পূজামণ্ডপের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় দেড় হাজার।
তবে ঢাকা মহানগরে এবার পূজামণ্ডপের সংখ্যা কিছুটা কমে দাঁড়িয়েছে ২৫৮টিতে। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ২৬১টি।
রাজধানীর ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির, রমনা কালীমন্দিরসহ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্দির ও পূজামণ্ডপে ইতোমধ্যে প্রতিমা স্থাপন, আলোকসজ্জা এবং অন্যান্য প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। পূজাকে কেন্দ্র করে মণ্ডপগুলোতে ভক্ত ও দর্শনার্থীদের সমাগম বাড়তে শুরু করেছে।
নিরাপত্তায় বিজিবি, আনসারসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী
দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সীমান্তবর্তী এলাকা, গুরুত্বপূর্ণ পূজামণ্ডপ, জনসমাগমস্থল এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে বাড়ানো হয়েছে নজরদারি ও টহল।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বিজিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পূজার নিরাপত্তায় সারা দেশে প্রায় ১০ হাজার সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। সীমান্তবর্তী মণ্ডপগুলোর পাশাপাশি দুর্গম এলাকাতেও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিজিবি প্রস্তুত রয়েছে বলে জানিয়েছে বাহিনীটি।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী আনসার-ভিডিপির ২ লাখ ১২ হাজার ৮১৮ জন সদস্যকে পূজার নিরাপত্তায় মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দিতে প্রস্তুত রাখা হয়েছে বিশেষ স্ট্রাইকিং টিম।
নিরাপত্তা জোরদারে মণ্ডপে মণ্ডপে দায়িত্ব পালন, নিয়মিত টহল, তথ্য আদান-প্রদান এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রতিমা বিসর্জনের সময়ও বাড়তি সতর্কতা ও নজরদারির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
প্রস্তুতিকালে হামলা-চুরির ঘটনায় উদ্বেগ
উৎসবের আগে দেশের কয়েকটি স্থানে প্রতিমা ও মন্দিরে হামলা, চুরি এবং লুটপাটের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পূজা উদ্যাপনকারী সংগঠনের নেতারা।
ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদক শুভাশীষ কুমার বিশ্বাস জানান, পূজার প্রস্তুতিকালে সিলেট, রাজবাড়ী, পঞ্চগড়, নেত্রকোনা ও টাঙ্গাইলসহ বিভিন্ন স্থানে প্রতিমা ও মন্দিরে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া ফরিদপুরের ঐতিহাসিক কালীমন্দিরে চুরি এবং সুনামগঞ্জে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও মন্দিরে হামলা-লুটপাটের ঘটনাও তুলে ধরেন তিনি।
এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেন আয়োজকরা। উৎসবের দিনগুলোতে ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রাখা এবং সব সম্প্রদায়ের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তারা।
আনন্দ-উৎসবের মধ্য দিয়ে বিজয়া দশমীতে বিদায়
পূজার সূচি অনুযায়ী, মহাসপ্তমী, মহাঅষ্টমী ও মহানবমীর আনুষ্ঠানিকতা শেষে বুধবার বিজয়া দশমীতে দেবী দুর্গাকে বিদায় জানাবেন ভক্তরা। এদিন প্রতিমা বিসর্জন উপলক্ষে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে শোভাযাত্রা ও অন্যান্য ধর্মীয় আয়োজন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
সব মিলিয়ে, শারদীয় দুর্গাপূজাকে ঘিরে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিরাজ করছে উৎসবমুখর পরিবেশ। ভক্তদের প্রত্যাশা, কঠোর নিরাপত্তা, পারস্পরিক সহযোগিতা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মধ্য দিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হবে এবারের দুর্গোৎসব।
আরু|



