বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্ট হ্যাকের অভিযোগের আট মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও ঘটনার রহস্যের সমাধান হয়নি। তদন্তের স্বার্থে তাঁর ব্যবহৃত মুঠোফোনসহ সংশ্লিষ্ট ডিভাইসগুলো চেয়ে অন্তত তিনবার চিঠি দিয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তবে ডিভাইসের নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা নিয়ে উদ্বেগ থাকায় এখনো সেগুলো তদন্ত সংস্থার কাছে হস্তান্তর করেনি বাদীপক্ষ।
গত ২৩ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, আদালতের অনুমতি নিয়ে ডিভাইসগুলো জব্দ ও ফরেনসিক পরীক্ষার উদ্যোগ নিয়েছে ডিবি। আগামী ৩ নভেম্বর মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য রয়েছে।
নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাদীপক্ষের
মামলার বাদী ও জামায়াতের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য মো. সিরাজুল ইসলাম জানিয়েছেন, তাঁরা ডিভাইস দিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন না। তবে গুরুত্বপূর্ণ ডিভাইসগুলোর নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা নিয়ে তাঁদের উদ্বেগ রয়েছে।
এ বিষয়ে ডিবি কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিকবার আলোচনা হয়েছে। বাদীপক্ষের প্রস্তাব, তাঁদের উপস্থিতিতেই যেন ডিভাইসগুলোর ফরেনসিক পরীক্ষা করা হয়।
সিরাজুল ইসলাম আরও জানান, মামলা দায়েরের সময় হ্যাকিং-সংক্রান্ত কিছু গবেষণাপত্র ও সরকারি সার্ভার রক্ষণাবেক্ষণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো জায়গা থেকে অ্যাকাউন্টে অননুমোদিত প্রবেশ হয়ে থাকতে পারে, এমন কিছু নথিপত্র তদন্ত সংস্থাকে দেওয়া হয়েছে।
ফরেনসিক পরীক্ষা কেন জরুরি?
মামলাটি তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগ। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, হ্যাকিংয়ের প্রকৃত ঘটনা ও এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে মূল ডিভাইসের ফরেনসিক পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ।
এর মাধ্যমে অ্যাকাউন্টে প্রবেশের সম্ভাব্য আইপি ঠিকানা, লগইন সেশন এবং কোনো ম্যালওয়্যার ব্যবহার করা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা সম্ভব হতে পারে।
এদিকে, এক্স কর্তৃপক্ষের কাছেও ঘটনার বিস্তারিত তথ্য চেয়ে যোগাযোগ করা হয়েছে। তবে এখনো তাদের কাছ থেকে চূড়ান্ত তথ্য বা প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি।
মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন বঙ্গভবনের কর্মকর্তা
এ ঘটনায় রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের সহকারী প্রোগ্রামার মোহাম্মদ ছরওয়ারে আলমকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। পরে আদালত থেকে জামিন পান তিনি। তদন্তের সময় তাঁর ব্যবহৃত মুঠোফোন, কম্পিউটার ও ল্যাপটপ জব্দ করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হয়। পরে ডিভাইসগুলো ফেরত দেওয়া হয়।
ছরওয়ারে আলম শুরু থেকেই নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। তাঁর দাবি, ঘটনার সঙ্গে তিনি জড়িত নন। সঠিক তদন্তের মাধ্যমে নিজের নির্দোষিতা প্রমাণিত হবে বলে আশা করছেন তিনি।
তবে তদন্ত কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ফরেনসিক প্রতিবেদন এবং এক্স কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয় তথ্য হাতে না আসায় এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।
যেভাবে শুরু হয়েছিল বিতর্ক
চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারি বিকেলে শফিকুর রহমানের এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে কর্মজীবী নারীদের নিয়ে একটি বিতর্কিত পোস্ট প্রকাশিত হয়। পোস্টটি ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয় এবং বিভিন্ন মহল থেকে প্রতিবাদ জানানো হয়।
পরে জামায়াতের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, সাইবার হামলার মাধ্যমে অ্যাকাউন্টটি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ওই পোস্ট প্রকাশ করা হয়েছে। অভিযোগ ওঠে, এ কাজে সরকারি ই-মেইল ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে।
এ ঘটনায় প্রথমে সাধারণ ডায়েরি এবং পরে রাজধানীর হাতিরঝিল থানায় মামলা করা হয়। মামলায় ছরওয়ারে আলমসহ অজ্ঞাতনামা ১৫ থেকে ২০ জনকে আসামি করা হয়।
অ্যাকাউন্টটি কীভাবে নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়েছিল, বিতর্কিত পোস্টটি কারা প্রকাশ করেছিল এবং এ ঘটনায় ছরওয়ারে আলমের কোনো সংশ্লিষ্টতা ছিল কি না, এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি।
সব মিলিয়ে, বাদীপক্ষের ডিভাইসের ফরেনসিক পরীক্ষা ও এক্স কর্তৃপক্ষের তথ্য পাওয়ার ওপরই তদন্তের পরবর্তী অগ্রগতি অনেকাংশে নির্ভর করছে। নির্ধারিত সময়ে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা যাবে কি না, সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
আরু|



