স্বাধীন, দায়িত্বশীল ও জবাবদিহিমূলক গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ও বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, রাষ্ট্রে গণতন্ত্র ও সুশাসন নিশ্চিত করতে হলে গণমাধ্যমকে অবশ্যই ক্ষমতাসীনদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। তবে অতীতে এই দায়িত্ব পালনের পরিবর্তে গণমাধ্যমের একটি অংশ ক্ষমতার কাছাকাছি অবস্থান নিয়েছিল, যার নেতিবাচক প্রভাব আজও পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি।
রোববার রাজধানীর রমনার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশের (আইইবি) সম্মেলনকক্ষে ন্যাশনাল এডিটরস কাউন্সিল (এনইসি) আয়োজিত ‘জুলাই শহীদ সাংবাদিক সম্মাননা’ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ পাঁচ সাংবাদিকের পরিবারের হাতে সম্মাননা স্মারক ও এক লাখ টাকা করে আর্থিক সহায়তা তুলে দেওয়া হয়।
বক্তব্যে মির্জা ফখরুল বলেন, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা কেবল তথ্য পরিবেশনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ব্যবহার, নীতিনির্ধারণ এবং জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট প্রতিটি বিষয়ে প্রশ্ন তোলা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাও গণমাধ্যমের দায়িত্ব। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে দেশে এমন একটি সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, যেখানে সমালোচনার পরিবর্তে ক্ষমতাকে সন্তুষ্ট করার প্রবণতা বেশি দেখা গেছে।
তিনি বলেন, এই সংস্কৃতি শুধু গণমাধ্যমেই সীমাবদ্ধ নয়; রাজনীতি, প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর বিভিন্ন স্তরেও এর প্রভাব রয়েছে। একটি আধুনিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের জন্য এই মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসার কোনো বিকল্প নেই।
স্থানীয় সরকারমন্ত্রী আরও বলেন, জাতিগতভাবে এই প্রবণতা কাটিয়ে উঠতে হলে মূল্যবোধভিত্তিক পরিবর্তন প্রয়োজন। রাষ্ট্র পরিচালনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা নিশ্চিত করা ছাড়া সেই পরিবর্তন সম্ভব নয়।
জুলাই সনদের বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিএনপি সনদে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে কিছু বিষয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করা হচ্ছে। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, যেসব ইস্যুতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য হয়নি, সেগুলো জনগণের রায় ও নির্বাচনী ইশতেহারের ভিত্তিতে ভবিষ্যতে বাস্তবায়নের কথা জুলাই সনদেই উল্লেখ রয়েছে।
সংবিধান সংস্কারের বিষয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, যেসব বিষয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য রয়েছে, সেগুলো সংসদীয় আলোচনার মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা সম্ভব। আর যেসব বিষয়ে মতপার্থক্য রয়েছে, সেগুলো আলোচনার টেবিলে সমাধান হওয়া উচিত। এ ক্ষেত্রে তিনি বিরোধী দলগুলোর সহযোগিতা কামনা করেন।
তিনি আরও বলেন, গত ১৫ বছরে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন খাতে যে ক্ষতি হয়েছে, তা অল্প সময়ে পূরণ করা সম্ভব নয়। তবে সংস্কার ও পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং সময়ের সঙ্গে এর ইতিবাচক ফল দৃশ্যমান হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ন্যাশনাল এডিটরস কাউন্সিলের সভাপতি ও আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে দেশে যেন আর কোনো স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের উত্থান না ঘটে, সে লক্ষ্যেই সম্পাদকদের এই প্ল্যাটফর্ম কাজ করবে। একই সঙ্গে রাজধানীর বাইরে কর্মরত সম্পাদকদেরও সংগঠনে সমান গুরুত্ব দেওয়া হবে।
বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) মহাসচিব কাদের গণি চৌধুরী জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণে একটি জাতীয় ‘জুলাই শহীদ চত্বর’ নির্মাণ এবং নিহত সাংবাদিকদের হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানান।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন দ্য ডেইলি ওয়াদার সম্পাদক শফিকুল আলম, সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আবদুল বাছির, প্রতিদিনের বাংলাদেশ সম্পাদক মারুফ কামাল খান, নয়া দিগন্ত সম্পাদক সালাহউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর, নিউ নেশন সম্পাদক মোকাররম হোসেন এবং দৈনিক জালালাবাদ সম্পাদক মুকতাবিস-উন-নূর। শহীদ সাংবাদিকদের পরিবারের সদস্যরাও দ্রুত বিচার ও স্বাধীন গণমাধ্যম নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
ইতি/


