রাজশাহীতে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরির একটি গাড়ি ঘিরে যে ঘটনা ঘটেছে বলে বিভিন্ন মাধ্যমে জানা যাচ্ছে, তা বই, জ্ঞানচর্চা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, স্থানীয় ছাত্রদলের কয়েকজন নেতা গাড়িটি আটকে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে নিয়ে যান এবং সেখানে থাকা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট কিছু লেখক-বুদ্ধিজীবীর বই নিয়ে আপত্তি তোলা হয়। পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে কিছু বই সরিয়ে ফেলার অঙ্গীকারনামা বা মুচলেকা দেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
ঘটনাটির সত্যতা, প্রেক্ষাপট ও আইনগত দিক সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। তবে একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকেই যায় রাষ্ট্র কর্তৃক আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা না করা কোনো বই কি কোনো ব্যক্তি, সংগঠন বা রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে পাঠকের নাগালের বাইরে সরিয়ে দেওয়া উচিত?
বাংলাদেশের ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, শেখ হাসিনা কিংবা অন্য যেকোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে নিয়ে লেখা বইয়ের সঙ্গে একমত হওয়া বা না হওয়া ব্যক্তিগত বিষয়। কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক সমাজে পাঠককে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দিতে হয়। বইয়ের জবাব বই দিয়ে, যুক্তির জবাব যুক্তি দিয়ে এবং মতের জবাব মত দিয়ে দেওয়াই সভ্যতার পথ।
বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র দীর্ঘদিন ধরে দেশের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে পাঠাভ্যাস গড়ে তোলার কাজ করে আসছে। সেই প্রতিষ্ঠানের ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরিতে কোন বই থাকবে বা থাকবে না সে সিদ্ধান্ত আদর্শগত পছন্দ-অপছন্দের ভিত্তিতে নয়, বরং আইন, নীতিমালা এবং পাঠকের জ্ঞানগত প্রয়োজনের ভিত্তিতে হওয়া উচিত।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে মতভেদ ছিল, আছে এবং থাকবে। কিন্তু মতভেদের কারণে বইকে অভিযুক্ত করা কিংবা পাঠকের সামনে থেকে সরিয়ে দেওয়ার সংস্কৃতি কখনোই সুস্থ গণতন্ত্রের লক্ষণ নয়। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও জ্ঞানচর্চাকে এক কাতারে ফেলা হলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশ।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের দিকে তাকালেও দেখা যায়, তাঁরা রাজনৈতিক বিরোধিতার মুখোমুখি হয়েছেন, কিন্তু বই-পুস্তক ও জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রকে সংকুচিত করার কোনো সংস্কৃতির সঙ্গে তাঁদের নাম জড়ায়নি। তাই আজও প্রত্যাশা থাকে বাংলাদেশের সকল রাজনৈতিক শক্তি বই, গ্রন্থাগার ও জ্ঞানচর্চার স্বাধীনতাকে সম্মান করবে।
একটি জাতি বই পড়ে এগিয়ে যায়, বই সরিয়ে নয়। ইতিহাসকে অস্বীকার করে নয়, বরং ইতিহাসের নানা দৃষ্টিভঙ্গি পড়ে, বুঝে এবং বিচার করার মধ্য দিয়েই একটি পরিণত সমাজ গড়ে ওঠে।
তাই কোনো বই নিয়ে আপত্তি থাকলে তার সমালোচনা হোক, পর্যালোচনা হোক, পাল্টা বই লেখা হোক; কিন্তু পাঠকের হাতে বই পৌঁছানোর পথ রুদ্ধ করার প্রবণতা আমাদের গণতান্ত্রিক ও সাংস্কৃতিক অগ্রযাত্রার জন্য কখনোই শুভ সংকেত হতে পারে না।
আরু/



