ভারতের কলকাতার নিউমার্কেট এলাকার মির্জা গালিব স্ট্রিটে ভয়াবহ হোটেল অগ্নিকাণ্ডের পর আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে বাংলাদেশি পর্যটকদের মধ্যে। বিশেষ করে চিকিৎসার জন্য কলকাতায় যাওয়া মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত বাংলাদেশিদের কাছে দীর্ঘদিন ধরে জনপ্রিয় এই এলাকাটি এখন অনেকটাই নীরব। ভয়াবহ ওই অগ্নিকাণ্ডে ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৭ জন বাংলাদেশি এবং ২ জন ভারতীয় নাগরিক।
বুধবার ভোররাতে মির্জা গালিব স্ট্রিটের ‘শিখা ইন’ হোটেলে আগুনের সূত্রপাত হয়। পাঁচতলা ভবনের ভেতরে একাধিক আবাসিক হোটেল ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ছিল। আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি ঘন ধোঁয়ায় অনেক অতিথি আটকা পড়েন। উদ্ধারকারীদের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় ভবনের সংকীর্ণ পথ, সীমিত বের হওয়ার ব্যবস্থা এবং ঘন ধোঁয়া। প্রায় ৮০ জনকে ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা হয়।
নিহত বাংলাদেশিদের মধ্যে কুষ্টিয়ার একটি পরিবারের চারজন সদস্য ছিলেন- একজন সাংবাদিক, তাঁর স্ত্রী, সন্তান ও শ্বশুর। এ ঘটনায় বাংলাদেশি পর্যটকদের মধ্যে শোকের পাশাপাশি নতুন করে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
কেন বাংলাদেশিদের কাছে এত জনপ্রিয় এই এলাকা?
কলকাতার নিউমার্কেট, সদর স্ট্রিট, মার্কুইস স্ট্রিট, লিনসে স্ট্রিট, মির্জা গালিব স্ট্রিট, ফ্রি-স্কুল স্ট্রিট ও আশপাশের এলাকাকে দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশি পর্যটকদের অন্যতম আবাসিক কেন্দ্র হিসেবে দেখা হয়।
কম খরচে থাকার ব্যবস্থা, নিউমার্কেটের কাছাকাছি অবস্থান, খাবারের দোকান, ওষুধের দোকান, মানি এক্সচেঞ্জ এবং বাংলাদেশে যাতায়াতকারী বাসের কাউন্টার সবকিছু হাতের নাগালে থাকায় চিকিৎসার জন্য কলকাতায় যাওয়া বাংলাদেশিরা এসব এলাকার হোটেল ও গেস্টহাউসকে বেশি পছন্দ করেন।
বিশেষ করে যাঁদের দীর্ঘদিন চিকিৎসার কাজে কলকাতায় থাকতে হয়, তাঁদের জন্য কম ভাড়ার এসব আবাসন গুরুত্বপূর্ণ। ফলে বছরের পর বছর ধরে বাংলাদেশি পর্যটকদের ওপর নির্ভর করে এই এলাকায় গড়ে উঠেছে বড় ধরনের হোটেল ব্যবসা।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন
অগ্নিকাণ্ডের পর সামনে এসেছে এসব হোটেলের অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নানা প্রশ্ন। একটি পাঁচতলা ভবনে একাধিক হোটেল পরিচালনা, সংকীর্ণ করিডর, পর্যাপ্ত জরুরি বের হওয়ার পথ না থাকা এবং অনেক কক্ষের জানালাবিহীন কাঠামো নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অগ্নিকাণ্ডের সময় এসব সীমাবদ্ধতা উদ্ধারকাজকে আরও কঠিন করে তুলেছিল বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
প্রাথমিক তদন্তে অগ্নিকাণ্ডের কারণ নিয়ে বিভিন্ন সম্ভাবনার কথা সামনে এসেছে। তবে আগুনের সঠিক কারণ তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত নয়। পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তদন্ত শুরু করেছে। কলকাতা পুলিশ এ ঘটনায় বিশেষ তদন্ত দলও গঠন করেছে।
১৩টি হোটেল-রেস্তোরাঁকে শোকজ
ঘটনার পর মির্জা গালিব স্ট্রিটে প্রশাসনের তৎপরতা বেড়েছে। ওই এলাকার ১৩টি হোটেল ও রেস্তোরাঁকে শোকজ করা হয়েছে বলে স্থানীয় প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। পাশাপাশি হোটেল ও গেস্টহাউসগুলোর বৈধতা, অগ্নিনিরাপত্তা এবং লাইসেন্সসংক্রান্ত বিষয়গুলোও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গ সরকারও কলকাতার বিভিন্ন হোটেল ও লজের অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যালোচনার উদ্যোগ নিয়েছে। অনিয়ম পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।
আতঙ্কে হোটেল ছাড়ছেন বাংলাদেশিরা
অগ্নিকাণ্ডের পর কলকাতায় অবস্থানরত অনেক বাংলাদেশি পর্যটকের মধ্যেই আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। কেউ কেউ নির্ধারিত সময়ের আগেই হোটেল ছেড়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছেন, আবার অনেকে চিকিৎসা বা ভ্রমণের পরিকল্পনা পিছিয়ে দিচ্ছেন। স্থানীয় পর্যটন ব্যবসায়ী ও হোটেল সংশ্লিষ্টদের বরাতে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
বাংলাদেশি পর্যটকদের কাছে বহু বছর ধরে পরিচিত ‘হোটেলপাড়া’ এখন তাই এক ভিন্ন চিত্র দেখছে। যেখানে আগে বাংলাদেশি পর্যটকদের ভিড়, সেখানে এখন নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা আর আতঙ্কই বেশি।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে যে এলাকাকে বাংলাদেশি পর্যটকদের জন্য কম খরচের ও সুবিধাজনক আবাসনের কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা হতো, সেই এলাকার হোটেলগুলো আসলে কতটা নিরাপদ?
মির্জা গালিব স্ট্রিটের এই অগ্নিকাণ্ড শুধু নয়জন মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়নি, কলকাতার হোটেল ব্যবসা এবং বাংলাদেশি পর্যটকদের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকেও কঠিন প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
আরু|



