সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের শতভাগ উপস্থিতি নিশ্চিত করতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার। কর্মস্থলে অনুপস্থিত কোনো চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মীর অনুপস্থিতির বিষয়টি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তার বেতন বিল ছাড় করা যাবে না।
একই সঙ্গে দেশের সব স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে আগামী ৩০ দিনের মধ্যে বায়োমেট্রিক হাজিরা ও জিও-ফেন্সিং প্রযুক্তি চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নির্ধারিত কর্মস্থলে উপস্থিত আছেন কি না, তা আরও কার্যকরভাবে নজরদারি করা হবে।
স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরীর সভাপতিত্বে গত ১৬ আগস্ট অনুষ্ঠিত এক সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ পরিদর্শন করে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া অনুশাসন বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনার অংশ হিসেবে সভাটি অনুষ্ঠিত হয়।
সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জালালউদ্দিন রুমি স্বাক্ষরিত অফিস আদেশ জারি করা হয়েছে।
বায়োমেট্রিক হাজিরা বাধ্যতামূলক
অফিস আদেশ অনুযায়ী, দেশের সব স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে বায়োমেট্রিক উপস্থিতি ব্যবস্থা কার্যকর করতে হবে। এর মাধ্যমে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়মিত হাজিরা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অনুপস্থিতির বিষয়টি ডিজিটালভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে।
এ ছাড়া আগামী তিন সপ্তাহের মধ্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ব্যবস্থাপনা তথ্যব্যবস্থার (এমআইএস) আওতায় রিয়েল-টাইম ডিজিটাল ড্যাশবোর্ড চালুর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এতে বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতির তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে।
বেতন, ছুটি ও পদোন্নতির সঙ্গে হাজিরা যুক্ত
চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের উপস্থিতির তথ্য সরকারি বেতন ব্যবস্থাপনা ‘আইবাস++’-এর সঙ্গে সমন্বয় করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ভবিষ্যতে হাজিরার তথ্যের সঙ্গে বেতন, ছুটি ও পদোন্নতির বিষয়ও যুক্ত থাকবে।
এ জন্য দায়িত্ব পালনের তালিকা বা ডিউটি রোস্টার এবং ছুটির তথ্যের মধ্যে থাকা অসামঞ্জস্য দ্রুত দূর করে তা ডিজিটাল ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অনুপস্থিত থাকলে আটকে যাবে বেতন বিল
নতুন নির্দেশনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—কর্মস্থলে অনুপস্থিত চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মীর বেতন বিল ছাড়ে কড়াকড়ি।
অফিস আদেশে বলা হয়েছে, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের শতভাগ উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়ার পরই বেতন বিল অগ্রায়ন করতে হবে। কোনো স্বাস্থ্যকর্মী কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকলে তার অনুপস্থিতির বিষয়টি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বেতন বিল ছাড় করা যাবে না।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ড্রইং অ্যান্ড ডিসবার্সিং (ডিডিও), অর্থ ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের কঠোরভাবে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মনিটরিং হবে বিভাগ ও জেলাভিত্তিক
শুধু বায়োমেট্রিক ব্যবস্থা চালু করেই থেমে থাকছে না স্বাস্থ্য বিভাগ। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের হাজিরা তদারকিতে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের বিভাগ ও জেলাভিত্তিক ‘ট্যাগ অফিসার’ হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
তারা নিয়মিত বায়োমেট্রিক হাজিরা পর্যবেক্ষণ করবেন। পাশাপাশি বিভাগীয় পরিচালক, হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক এবং সিভিল সার্জনদের প্রতি সপ্তাহে ই-হাজিরা সংক্রান্ত প্রতিবেদন পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নতুন পরিচালক (ক্লিনিক ও হাসপাতাল) ডা. মো. নুরুল ইসলাম জানিয়েছেন, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের কর্মস্থলে উপস্থিতি নিশ্চিত করতেই এসব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অধিকাংশ হাসপাতালে বায়োমেট্রিক ব্যবস্থা চালু থাকলেও কোথাও কোথাও সেটি নষ্ট রয়েছে বা নিয়মিত ব্যবহার করা হচ্ছে না। সেসব দ্রুত ঠিক করে সবাইকে নিয়মের আওতায় আনার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
এর আগে কর্মস্থলে অনুপস্থিতির অভিযোগে চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। গত জুলাইয়ে অনুমোদন ছাড়া কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার অভিযোগে সাতক্ষীরার চার চিকিৎসককে সাময়িক বরখাস্ত করে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়।
স্বাস্থ্য বিভাগের নতুন এই ব্যবস্থা কার্যকর হলে সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মীদের উপস্থিতি আরও কঠোরভাবে নজরদারির আওতায় আসবে। একই সঙ্গে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থেকে বেতন নেওয়ার সুযোগও সীমিত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আরু/



