বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সৌরির রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় নতুন মোড় নিয়েছে তদন্ত। নিখোঁজ হওয়ার আগে যার সঙ্গে কয়েক ঘণ্টা সময় কাটিয়েছিলেন তাহসিফ, সেই বন্ধুস্থানীয় ছোট ভাই আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে হেফাজতে নিয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তার দেওয়া তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের পাশাপাশি ঘটনার বিভিন্ন দিক নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাবর রোডের বি ব্লকের একটি বাসা থেকে দীপকে পিবিআই সদস্যরা নিয়ে যান।
শুক্রবার সকালে পিবিআইয়ের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পুলিশ সুপার মো. আবু ইউসুফ বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, তাহসিফ ও দীপ একসঙ্গে কোথায় কোথায় গিয়েছিলেন, সে বিষয়ে দীপের দেওয়া তথ্য যাচাই করা হচ্ছে।
তবে দীপকে হেফাজতে নেওয়ার অর্থ এই নয় যে তিনি অপরাধে জড়িত, তদন্তের স্বার্থেই তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এ ঘটনায় এখনো তার বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত হয়নি।
নিখোঁজ হওয়ার আগে দীপের সঙ্গে দেখা
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় দীপের সঙ্গে দেখা করতে বাসা থেকে বের হয়েছিলেন তাহসিফ। এর আগে সারাদিন পরিবারের সদস্যদের জন্য কেনাকাটা করেছিলেন তিনি। সন্ধ্যার পর মাকে জানিয়েছিলেন, দীপ এসেছে, তার সঙ্গে কথা বলে আসবেন। এরপর আর বাসায় ফেরেননি।
প্রকাশ্যে আসা সিসিটিভি ফুটেজেও তাহসিফের সঙ্গে দীপের দেখা হওয়ার দৃশ্য পাওয়া গেছে। ফুটেজে দেখা যায়, সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে রাজধানীর উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরে রাজউক উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের একটি গ্যারেজের সামনে দুজনের দেখা হয়। তারা পরস্পরের সঙ্গে হাত মেলান। কিছুক্ষণ পর আলাদা দুটি মোটরসাইকেলে সেখান থেকে বেরিয়ে যান।
তাহসিফের পরিবারের সদস্যরা ফুটেজের ব্যক্তিকে দীপ হিসেবে শনাক্ত করেন। নিখোঁজ হওয়ার আগে তাহসিফের সঙ্গে দীপের প্রায় সাড়ে পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা সময় কাটানোর তথ্যও সামনে এসেছে।
দীপের বক্তব্যে কী জানা গেছে?
তাহসিফের মোটরসাইকেলে কারিগরি সমস্যা দেখা দেওয়ায় দুজন একটি ওয়ার্কশপে গিয়েছিলেন বলে জানিয়েছিলেন দীপ।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, মেরামতের কাজ শেষে তারা বাসায় ফিরে একসঙ্গে খাবার খান। পরে তাহসিফ নিজের কাজে চলে যান এবং দীপও নিজের বাসায় ফিরে যান।
তবে এরপর কী ঘটেছিল, তাহসিফ কীভাবে তুরাগ নদে পৌঁছালেন এবং তার মৃত্যুর পেছনে কোনো অপরাধমূলক ঘটনা রয়েছে কি না, এসব বিষয় এখন তদন্তের আওতায়।
তুরাগ নদ থেকে উদ্ধার হয় মরদেহ
এর আগে, ২৮ অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে রাজধানীর উত্তরখানের রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন তুরাগ নদে একটি মরদেহ ভাসতে দেখে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ খবর দেন স্থানীয়রা। পরে টঙ্গী নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা মরদেহটি উদ্ধার করেন।
উদ্ধারের সময় মরদেহের হাতে থাকা বিশেষ ঘড়ি এবং পকেটে পাওয়া আইফোনের সূত্র ধরে স্বজনেরা পরিচয় শনাক্ত করেন। এটি নিখোঁজ সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সৌরির মরদেহ বলে নিশ্চিত হওয়া যায়।
পরে বৃহস্পতিবার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। একই দিন বিকেলে উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে জানাজা শেষে ১২ নম্বর সেক্টর কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
হত্যার অভিযোগ পরিবারের, অপেক্ষা ময়নাতদন্তের ফলের
তাহসিফের মৃত্যুকে শুরু থেকেই স্বাভাবিক হিসেবে দেখছে না তার পরিবার। তার বাবা কে এম এনায়েতুল করিম ছেলেকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে নদে ফেলে দেওয়া হয়েছে বলে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।
তবে নৌ-পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্য অনুযায়ী, মরদেহে বাইরে থেকে দৃশ্যমান কোনো আঘাত বা জখমের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন গুরুত্বপূর্ণ বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এদিকে, তাহসিফের সঙ্গে শেষ সময়ে থাকা দীপকে হেফাজতে নিয়ে তার দেওয়া তথ্য যাচাই করছে পিবিআই। ফলে সিসিটিভি ফুটেজ, দুজনের চলাচল, মোটরসাইকেল মেরামতের ঘটনা এবং নিখোঁজ হওয়ার পরের সময়ের তথ্য মিলিয়ে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এখন তদন্তের ফল এবং ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনই স্পষ্ট করতে পারে, কীভাবে মৃত্যু হয়েছিল সাবেক এই বিমানবাহিনী কর্মকর্তার।
আরু|



